চট্টগ্রামে আবর্জনার পাহাড় ও অবৈধ বানিজ্য

0

জুবায়ের সিদ্দিকীঃ  নগরীর অনেক জনগুরুত্বপুর্ন সড়কের পাশে ময়লার স্তুপ। লালখান বাজার মোড় থেকে স্টেডিয়ামের দিকে যেতেই ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট এর প্রাচীরের পাশে পুটপাতের উপর ডাস্টবিন। একটু সামনে চট্টগ্রাম ক্লাব, রেডিসন ব্লু ও স্টেডিয়াম। এমন অবস্থা নগরীর চকবাজার, কাপাসঘোলা, আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, মাদারবাড়ি, মোগলটুলি, হালিশহর এলাকার।

রাস্তার পাশে যত্র তত্র ফেলে রাখা ময়লা-আবর্জনার স্তুপ নগরীকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। কোন কোন এলাকায় ময়লার বিন ব্যবহার হচ্ছে বাসাবাড়িতে চাউল আটা রাখার কাজে। নগরীর প্রায় মহল্লার অলিতে গলিতে দিনভর দেখা যায় ময়লার পাহাড়। আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকায় ভ্যাট কমিশনরারেট কার্যালয়ের সামনে ময়লার স্তুপ এলাকার পরিবেশকে কলুষিত করছে। আগ্রাবাদ চৌমুহনী মার্কেটের পেছনে ময়লার স্তুপের ডিঙ্গিয়ে মানুষ চলাফেরা করে। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে ময়লার ডিপোর কাছাকাছি ২৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলরের বাড়ি।

যে কোন নগরীর জন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন। বর্জ্য ব্যবস্থাপায় যে কোন রকমের গাফেলতি কিংবা দুর্বলতার জন্য নগরীর অভিভাবক মেয়র মহোদয় দায় এড়াতে পারেন না। দুনিয়াতে এমন নগরীও আছে, বিশেষ করে পর্যটন নগরী সমুহ, যেখানে সর্বমোট রাজস্ব আয়ের অর্ধেক ব্যয় হয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে। তবে নগরীগুলো শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খাতে এত টাকা ব্যয় করতে পারে না। তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং বেতন খাতে অনেক টাকা ব্যয় করতে হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও চট্টগ্রামকে এ ধরনের নগরীগুলোর কাতারে শামিল করা যায়।

২০১১ সালের আদমসুমারির হিসাব অনুযায়ী চট্টগ্রাম নগরীর ৪১ ওয়ার্ডের জনসংখ্যা প্রায় ২৬ লক্ষ। চট্টগ্রামের এই ৪১ ওয়ার্ডের বাইরের নগরায়িত এলাকাসমুহকে হিসাবের মধ্যে আনা হলে নগরীর জনসংখ্যা হবে প্রায় ৫০ লক্ষ। ইতিপুর্বে বাংলাদেশ মিউনিসিপাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর একটি গবেষনা চলিয়েছিল। তারা চট্টগ্রাম নগরীতে জনপ্রতি দৈনিক বর্জ্য উৎপাদনের পরিমান লক্ষ্য করেছেন ০.৩৫২ কেটি। কোন কোন হিসাবে চট্টগ্রাম নগরীতে জনপ্রতি দৈনিক বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ ০.৪ কেজি। জনপ্রতি দৈনিক বর্জ্য উৎপাদনের পরিমান ০.৩৫২ কেজি থেকে ০.৪ কেজি ধরলে চট্টগ্রাম নগরীর ৪১ ওয়ার্ডের দৈনিক সর্বমোট বর্জ্য উৎপাদনের পরিমান হবে ৯১৩ থেকে ১০৩৭ টন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন প্রতিটা ওয়ার্ড থেকে ময়লা অপসারন করে না।

শুধুমাত্র কনজারভেন্সি ওয়ার্ড সমুহ হতে ময়লা অপসারন করে থাকে। নগরীর অনেক ওয়ার্ড এখনো কনজারভেন্সি সুবিধা হতে বঞ্চিত। এসব ওয়ার্ড সমুহ হতে সিটি কর্পোরেশন ময়লা অপসারন করে না। যে পরিমান বর্জ্য উৎপাদিত হয় তার অর্ধেকটার মত সিটি কর্পোরেশন অপসারন করতে পারে, বাকিটা নালা-নর্দমায়, খালে-বিলে এবং পরিত্যক্ত কিংবা অব্যবহুত জমিতে স্তুপীকৃত হয়ে পড়ে থাকে। যদিও সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ দাবী করে ২৭টি কনজারভেন্সি ওয়ার্ডের প্রায় ৯০ শতাংশ ময়লা তারা অপসারন করে থাকে। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা হলো রাস্তা ঘাটে প্রচুর পরিমান আবর্জনা দৃশ্যমান থাকে।

সিটি কর্পোরেশনের ময়লা আবজর্নাবাহী ট্রাক সমুহ এলাকা ভিত্ত্বিক ময়লা সংগ্রহ করে আরেফিন নগর এবং হালিশহরস্থ ডাম্পিং ইয়ার্ডে ফেলে আসে। নগর কর্তৃপক্ষের আবর্জনা অপসারনের কাজে নিয়োজিত ট্রাকসমুহ দৈনিক চার বারের বেশি ট্রিপ দিতে পারে না। বর্জ্য উৎপাদন এবং বর্জ্য ফেলে আসার স্থানের মধ্যে বিস্তৃত দুরত্ব এবং ট্রাফিক জ্যাম ইত্যাদির কারনে প্রতি ট্রাক চারটির বেশি ট্রিফ দিতে পারে না। যদি দৈনিক ট্রাক প্রতি ট্রিপের সংখ্যা ৬-৭ ট্রিপে উন্নীত করা যেত, তাহলে রাস্তা ঘাটে, খালে-নালায় এবং পতিত জমিতে কোন ময়লা পড়ে থাকতে দেখা যেত না। সব ময়লাই সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক অপসারন করা সম্ভব হত।

ট্রাক এবং ট্রাক প্রতি জনবলের সংখ্যা একই রেখে বর্জ্য অপসারনের জায়গার দুরত্ব কমানো গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। যদি দুটি ময়লা ফেলার স্থানের পরিবর্তে শহরের চার প্রান্তে চারটি ময়লা ফেলার স্থান নির্বাচন করা যায়, তবে একই জনবল ও একই পরিমাণের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুন ময়লা অবসারন করা সম্ভব হবে। শহরের অভ্যন্তরে আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে তেরটি স্থানকে প্রাথমিক ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

এসব স্থানের মধ্যে ৪টি চট্টগ্রাম শহরের চার প্রান্তে অবস্থিত। অন্যান্য আনুষাঙ্গিক সুবিধাধি ও খালি জায়গার পরিমাণ বিবেচনায় এই স্থানগুলোতে ময়লা ফেলার জন্য সুবিধাজনক বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি ব্যাক স্কুল হতে ১ কি.মি দুরে অবস্থিত। চট্টগ্রাম মহিলা পলিটেকনিক্যাল কলেজ, হালিশহর এলাকায় আরেকটি খালী জায়গা আছে। মোহরা ওয়ার্ডের হামিদপুর প্রাইমারী স্কুলের নিকট একটি বড় জায়গা খালী আছে। উত্তর পাহাড়তলীতে দারুল কোরআন মাদ্রাসার পশ্চিমে বড় খালি জায়গা আছে। চট্টগ্রাম শহরকে চার ভাগে বিভক্ত করলে প্রতিটি বিভাগের মধ্যে এ চারটি প্রস্তাবিত স্থানের একটির অবস্থান হবে।

ময়লাবাহী গাড়িগুলোকে যদি এই চারটি স্থানের মধ্যে বন্টন করে দেয়া যায় তাহলে চলাচলের দুরত্বকে বিবেচনায় নিলে বর্তমানে তারা যে কয়টি ট্রিপ দিতে পারে তার চেয়ে দ্বিগুন ট্রিপ দিতে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের অলিতে গলিতে ডাস্টবিনগুলির নির্ধারিত অবস্থান আছে। তারপরও দেখা যায় শহরের পুটপাতের পাশে, অলি-গলিতে ও রাস্তার পাশে দিনের পর দিন পড়ে থাকছে ময়লা-আবর্জনা। নালা থেকে আবর্জনা উত্তোলন করার পর নালার পাশে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয় না। নগরীর অনেক আবাসিক এলাকায় ময়লা আবজর্নার স্তুপ পড়ে থাকলেও অপসারন করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ওয়ার্ড পর্যায়ে দায়িত্বশলীরা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেন না।

এদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ডোর টু ডোর ময়লা সংগ্রহের উদ্যোগ ছিল প্রশংসিত। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারী থেকে বর্তমান সিটি মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন নগরের কয়েকটি ওয়ার্ডে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। ফলে নগরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরে আসে। এ জন্য নগরবাসীকে বাড়তি কোন খরচ দেওয়ার নিয়ম নেই। সিটি কর্পোরেশনের নিয়ম ভঙ্গ করে লালখান বাজার ওয়ার্ডের মতিঝর্না এলাকার বাসিন্দাদের কাছ থেকে মাসিক ৫০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সিটি কর্পোরেশন ডোর টু ডোর বর্জ্য সংগ্রহের জন্য কাউকে খরচ দিতে হবে না।

কেউ এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটালে সিটি কর্পোরেশন ব্যবস্থা নেবে। লালখান বাজার ওয়ার্ডের মতিঝর্না এলাকায় স্বল্প আয়ের মানুষের বসবাস। এটি বস্তি এলাকা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বর্জ্য সরানোর জন্য গরীব মানুষের উপর খরচের চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। জানা গেছে, ডোর টু ডোর ময়লা আবর্জনা সরানোর জন্য ’মতিঝরনা মহল্লা পরিষদ’ স্থানীয় বাসিন্দাদের ৫০০ টাকা করে আদায়ের রসিদ দিচ্ছে। দুই বছর ধরে এই টাকা নেওয়া হচ্ছে।

এ কাজে মোহাম্মদ শাহাদাত ও পারভেজ সহ অনেকে জড়িত। বাসিন্দাদের কাছ থেকে টাকা তোলার কাজ সমম্বয় করেন তারা। স্থানীয় আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এই কাজে জড়িত বলে জানা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতি ঘর থেকে ৫০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। ময়লা সরানোর জন্য দুজন লোককে নামমাত্র বেতন দেওয়া হয়। বাকি টাকা ভাগ ভাটোয়ারা হয়ে যায়। এ ব্যাপারে জানতে স্থানীয় কাউন্সিলরকে ফোনে পাওয়া যায়নি। নগরীর অনেক ওয়ার্ডে সেবকদের টাকা কাউন্সিলর ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগ ভাটোয়ারার অভিযোগ রয়েছে। ময়লা অপসারন ও ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এখনই গুরুত্ব দেওয়া না হলে অনাগত বর্ষা ও রমজান মাসে দুর্ভোগে পড়বে মানুষ।

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.