চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুমকির মুখে নগরবাসী

0

জুবায়ের সিদ্দিকীঃ বন্দরনগরী চট্টগ্রামের নিচু এলাকা এবং জলাধার ও জলাশয় ভরাট করে ভবন তৈরী করা হচ্ছে। এতে ড্রেনেজ এলাকা কমে যাচ্ছে। আবার নালা-নর্দমা ও খালগুলো দখল করে স্থাপনা নির্মান করা হয়েছে। অবৈধভাবে পাহাড় কাটার ফলে পাহাড়ী বালু নালা ও খালে পড়ে তা ভরাট হয়ে গেছে।

খালের ভেতর সেবা সংস্থার পাইপলাইন গিয়ে পানি নিস্কাষনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। নালা নর্দমা ও খালকে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করার মানসিকতাও জলাবদ্ধতার প্রকট হওয়ার কারন। চট্টগ্রাম নগর সাগর ও নদীর পাশে গড়ে উঠেছে। ভরাট হয়ে গেছে প্রিয় নদী কর্ণফুলী। লাগাতার ড্রেজিং না করায় নদীর তলদেশে পানি ধারন ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে গেছে।

ফলে জোয়ারের পানি অবাধে শহরে প্রবেশ করে লোকালয় তলিয়ে যায়। যখন একই সময়ে বৃষ্টিপাত ও উচ্চ জোয়ার থাকে, তখন জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সাগর, নদী, বন আর পাহাড়ঘেরা চট্টগ্রামের নাম শুনলে এখন আর প্রকৃতির সুন্দর রূপ ভেসে উঠে না বরং কল্পনায় ভেসে আসে জলাবদ্ধতার ছবি। হাঁটু থেকে কোমরপানি ডিঙ্গিয়ে হাঁটছে মানুষ। ডুবে থাকা রাস্তায় পথ খুজে পায় না গাড়ি। এক দশকের বেশি সময় ধরে জলাবদ্ধতার সমস্যাটি প্রকট হয়ে উঠেছে। ব্যতিক্রম হবে না এবারও। ডুবে থাকা নগরীর ছবি এবারের বর্ষায়ও দেখা যাবে। ভরা বর্ষায় প্রতিদিন জলাবদ্ধতার আতংকে থাকে নগরবাসী।

বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এই জনদুর্ভোগ। নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীদের মতে, পরিকল্পিতভাবে এই টাকা খরচ করা হয়নি। সিটি কর্পোরেশনকে পাশ কাটিয়ে মেগা প্রকল্পসহ বড় বড় প্রকল্পগুলো দেয়া হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) কে। অপরদিকে সিটি কর্পোরেশন রুটিন কাজ করে দায় সেরেছে। জলকষ্ট দুর করার টাকা পাওয়া যায়নি। সিডিএ’র মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে চরম ব্যর্থতার দরুন জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগে এবার দুইবার ডুবেছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা। গত বছর বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে একটানা পাঁচদিন ডুবে ছিল নগরীর গুরুত্বপুর্ন সড়ক আগ্রাবাদ এক্সেস ও দুই পাশের নির্মাঞ্চল, চকবাজার, বাকলিয়াসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকা।

মুষলধারের বৃষ্টিতে নগরীর প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা ডুবে যায়। আগ্রাবাদের একটি হাসপাতালসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকাও ডুবে যায়। গত এক বছরে আগ্রাবাদ এক্সেস রোড় ও পোর্ট কানেক্টিং রোড়ের সংস্কার কাজ কিছুটা দৃশ্যমান হলেও সুফল বয়ে আনেনি। এখনো গুরুত্বপুর্ন দুই সড়কের সংস্কারকাজ চলমান আছে। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের ২২টিতেই বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে জলাবদ্ধতার সমস্যা দীর্ঘদিনের। নগরীর প্রায় ৭০ লাখ বাসিন্দার মধ্যে প্রায় ৩৩ লাখ মানুষ এসব ওয়ার্ডে বসবাস করেন। জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাতে হয় দক্ষিণ আগ্রাবাদ, উত্তর আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, পুর্ব ষোলশহর, শুলকবহর, চকবাজার, পশ্চিম বাকলিয়া, পুর্ব বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, পাঠানটুলী, বক্সিরহাট, গোসাইলডাঙ্গা, উত্তর মধ্যম হালিশহর এলাকার মানুষদের।

এ ছাড়া পাঁচলাইশ, মোহরা, পশ্চিম ষোলশহর, উত্তর কাট্টলী, রামপুর, উত্তর হালিশহর, বাথরঘাটা, দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর ও দক্ষিণ হালিশহরের বাসিন্দাদেরও জলাবদ্ধতায় ভুগতে হচ্ছে। এই ৯টি ওয়ার্ডে বসবাস করে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ মানুষ। তবে এই সমস্যা নিরসনের জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিন। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চীনের একটি প্রতিষ্টানের মাধ্যমে পৃথকভাবে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতার কারনগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম নগরীর বৃষ্টির পানি নিস্কাশনের প্রধান মাধ্যম চাক্তাই খাল। সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর সময় চাক্তাই খালের তলা পাকা ও দউ পাশে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মান করা হয়।

তবে দু’তিন বছরের মধ্যে আবার খাল ভরাট হয়ে যায়। এতে খালের আশপাশের এলাকার চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, বউবাজার, মাষ্টারপুল, মিয়াখান নগর, ডিসি রোড়, চকবাজার, বাকলিয়া ও কাপাসঘোলা এলাকায় আবার জলাবদ্ধতা দেখা যায়। বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে দুই পাড় উপচে তলিয়ে যেত বসতঘর, রাস্তাঘাট ও ব্যবসা প্রতিষ্টান। বিশেষ করে ঘুর্নিঝড়, অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানি হলে ভয়াবহ আকার ধারন করতে পারে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বরাদ্দ পায়। কর্পোরেশনের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের হার ১৭ থেকে ৩৫ শতাংশ উঠানামা করে।

আর রাজনৈতিক বিবেচনায় কম গুরুত্বপুর্ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়। খাল ও নালা নর্দমা থেকে মাটি উত্তোলন করে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব নয়। এ সমস্যা দুর করতে সিটি কর্পোরেশনের নেতৃত্বে সব সংস্থার সমন্বয়ের বিকল্প নেই। যখন নাগরিক দুর্ভোগ চরমে উঠে তখন লোকদেখানোর জন্য সিটি কর্পোরেশন ও সিডিএ মাঠে নামেন। এই সমস্যা সমাধান করতে ১৯৯৫ সালে প্রনীত চট্টগ্রাম ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়য়েন উপর গুরুত্ব দেয়া হলেও এ বিষয়ে সিডিএ’কে দেখা গেছে নিশ্চুপ।

জোয়ারের পানিজনিত জলাবদ্ধতা নিরসনে কর্নফুলী ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত খালগুলোর মুখে ৩৬টি টাইডাল রেগুলেটর নির্মানের কথা বলা হয় মহাপরিকল্পনায়। এখন পর্যন্ত একটি ফটকও নির্মান করা হয়নি। ফলে চাক্তাই, রাজাখালী, ডোমখালী ও মহেশখাল দিয়ে পানি ডুকে নগরীর বিভিন্ন এলাকা বৃষ্টি ছাড়াই ডুবে যায়। চট্টগ্রাম শহরে কোন ড্রেনেজ ও ঝড়বৃষ্টিজনিত সৃষ্ট পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। ফলে বর্ষা মৌসুমে অল্প বৃষ্টিতেই নগরীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

এ সমস্যা নিরসনে নগরীর মেগা প্রকল্প এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এ জন্য সম্পুর্ন দায়ী সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। তাঁর ব্যর্থতা ও খামখেয়ালীপনার কারনে দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ। তিনি সিডিএ’র চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত থাকা অবস্থায় যত্র তত্র বহুতল ভবন নির্মানের অনুমতি দিলেও তার যথাযথ নজরদারী করা হয়নি। যে কারনে ভৌগলিক অবস্থানগত কারণ, সমতল আর নিচু ভুমি ও তার সঙ্গে ঘনবসতির কারনে খুব সহজেই নানা সামুদ্রিক ঘুর্ণিঝড় ও সুনামীর মত প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুমকির মুখে আছে চট্টগ্রাম নগরী। ঝুর্ণিঝড় ও সুনামীর মূল কারনটা হচ্ছে সমুদ্র। তার সাথে আছে উপকুলীয় ভুখন্ড। আছে সুর্য, বায়ুমন্ডল, বায়ুমন্ডলের ঘনত্বের তারতম্য। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ও পরে আঘাত হানা ঘুর্নিঝড়গুলোতে ব্যাপক ক্ষত্রিগ্রস্থ হয়েছিল চট্টগ্রাম।

১৯৯১ এর ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পুর্ব চট্টগ্রাম বিভাগের উপর আঘাত হানে স্মরনকালের ভয়াবহতম ঘুর্নিঝড়। এর ফলে ৬ মিটার উচ্চতায় জলোচ্ছাসে উপকুলীয় এলাকা প্লাবিত হয়। এর ফলে ১ লক্ষ ৩৮ হাজার মানুষ নিহত হয়। এ ছাড়া প্রায় ১ কোটি মানুষ সর্বস্ব হারায়। তার পরও অরক্ষিত রয়ে গেছে চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন উপকুলীয় এলাকা। পর্যাপ্ত আশ্রয় কেন্দ্র নেই। উদ্ধার তৎপরতায় সেবা সংস্থাগুলোর আধুনিক সরঞ্জাম নেই। নেই প্রশিক্ষিত জনবল। মানুষের প্রধান সমস্যাগুলো দুর করতে অগ্রনী ভুমিকা নিতে হবে। তা না করে কেবল ফ্লাইওভার বা সড়ক সম্প্রসারন করলে সব শ্রেনীর মানুষের ঘরে সুফল পৌছাবে না।

শহরের প্রধান খালগুলো দ্রুত খনন ও খালের মুখে স্যুইচ গেইট নির্মান, কর্নফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যকর ও শহর রক্ষাবাধকে শক্তিশালী করতে হবে। তা নাহলে গোটা চট্টগ্রাম থাকবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হুমকির মুখে। যে কোন সময় গভীর পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে এ নগরী। অবিলম্বে বর্ষাকে সামনে রেখে সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ,চট্টগ্রাম বন্দর, কর্নফুলী গ্যাস, চট্টগ্রাম ওয়াসা, বিদ্যুৎ. পানি উন্নয়ণ বোর্ড়, টিএন্ডটি, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক ও জনপদসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এখানে অপ্রিয় হলেও একটি কথা বলা প্রয়োজন, বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরগুলোতে দায়িত্বশীল উর্ধতন কর্মকর্তাদের চট্টগ্রাম বিদ্বেষী আচরন লক্ষ্য করা গেছে বারবার। তা সত্ত্বেও চট্টগ্রামের জনপ্রতিনিধিদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই পারে চট্টগ্রামের দুর্দিনকে সুদিনে ফিরিয়ে আনতে। নগরীকে সুন্দর ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হলে এই ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। সমুহ জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দিতে হলে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে। ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

এবার আশার আলো দেখছেন চট্টগ্রামবাসী। নব নিযুক্ত সিডিএ চেয়ারম্যান ও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বৈঠক করেছেন। এর আগে নগরীর উন্নয়নে সিডিএ চেয়ারম্যান ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সংম্পৃক্ত করেছেন। শুক্রবার সিটি মেয়র আ জ ম নাসির উদ্দিন সিডিএ ভবনে গিয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষের সাথে প্রায় ২ ঘন্টা বৈঠক করেছেন। গত ১০ বছর মেয়র সিডিএর সিড়ি মাড়াননি। বিগত চেয়ারম্যান ও মেয়রের মধ্যে বৈরিতা ছিল প্রকাশ্যে। যার ফলে জলাবদ্ধতা নিরসনে কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। এর কুফল ভোগ করছে নগরবাসী।

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.