ধারাবাহিকতার আরেক নাম মুশফিক

0
প্রতিভায় হয়তো মোহাম্মদ আশরাফুল কিংবা তামিম ইকবালের সমান নন, তবে পরিশ্রম আর আত্মনিবেদনে বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেটার নিঃসন্দেহে মুশফিকুর রহিম। অনুশীলনে মুশফিক সবচেয়ে বেশি ঘাম ঝরান, ঐচ্ছিক অনুশীলনেও যাঁকে মাঠে পাওয়াটা নিশ্চিত তাঁর নাম মুশফিক। খেলাটার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও একাগ্রতার প্রতিদান হিসেবে নিয়মিতই রান পাচ্ছেন মুশফিক, যা তাঁকে পরিণত করেছে দলের আস্থার প্রতীকে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের সাফল্যে বড় অবদান ছিল মুশফিকের। পাকিস্তানের বিপক্ষে কালকের সেঞ্চুরি সেই ধারাবাহিকতারই  প্রতিফলন।
কিছুটা আবেগপ্রবণ ও অভিমানী, কিন্তু ব্যাট হাতে গত বছর দেড়েক ধরে বিস্ময়কর ধারাবাহিক মুশফিক। এই সময়ে ব্যক্তিগত জীবনে এসেছে বদল, জীবনের জুটি যেমন খুঁজে পেয়েছেন তেমনি হাতছাড়া হয়েছে ওয়ানডের অধিনায়কত্বও। কিন্তু তাতে মুশফিকের ব্যাটে কোনো প্রভাবই পড়েনি। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে সবচেয়ে বড় অপবাদ অধারাবাহিকতার, সেই দুর্নাম ঘুচিয়ে মুশফিক রান করে গেছেন নিয়মিত। বিশ্বকাপের ৬ ম্যাচে ৩ ইনিংসেই হাফ সেঞ্চুরি, তাও নিছক পঞ্চাশ পেরিয়েই থেমে যাওয়া নয়। সবগুলো জয়েই গুরুত্বপূর্ণ অবদান মুশফিকের। শুধু কি তাই, মুশফিক নিজে যে শুধু রান করেন তাই নয়, রান করেন অন্য প্রান্তের ব্যাটসম্যানকে সঙ্গী করেও। আফগানিস্তানের সঙ্গে ইনিংসের সবচেয়ে বড় জুটিটা ছিল ১১৪ রানের, গড়েছিলেন সাকিব আল হাসানের সঙ্গে জুটি বেঁধে। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমে তামিম ইকবাল এবং পরে সাকিবকে সঙ্গী করে দুটো দারুণ জুটিতেই জয়ের পথে ছিল বাংলাদেশ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাহমুদ উল্লাহর সেঞ্চুরির চেয়ে কোনো অংশে কম নয় মুশফিকের ৭৭ বলে খেলা ৮৯ রানের ইনিংসটা। ব্যাটিং অর্ডারে পিছিয়ে থাকায় যখন ব্যাট করতে নামেন তখন হয়তো সেঞ্চুরির সুযোগ সেভাবে থাকে না। তাই ওয়ানডে ক্যারিয়ারে তাঁর সেঞ্চুরি মোটে দুটি- ২০১১ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়ে এবং গত বছর ভারতের বিপক্ষে। কাল ধারাবাহিকতার পুরস্কার হিসেবে ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরির দেখা পেয়ে গেলেন মুশফিক। আর সেটিও কী রাজসিক ভঙ্গিমায়!
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৭২, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৭৭, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৭১ কিংবা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮৯- এই ইনিংসগুলোর যেকোনোটাই পৌঁছাতে পারত তিন অঙ্কের মাইলফলকে। পৌঁছায়নি বলে হয়তো অল্প হলেও খানিকটা আক্ষেপ থেকে যেতে পারে মুশফিকের মনে। কাল পাকিস্তানের বিপক্ষে ইনিংসটা হয়তো ভুলিয়ে দেবে সেই অতৃপ্তি। ৬৯ বলে শতরান করেছেন মুশফিক, ১৩ বাউন্ডারিতে আর ২ ছক্কায়, যা তাঁকে করেছে বাংলাদেশের তৃতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ান। ৬৩ ও ৬৮ বলে সেঞ্চুরি করে একই সঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানটা অবশ্য দখল করে রেখেছেন সাকিব আল হাসান। সেঞ্চুরিতে পৌঁছানোর বল সংখ্যায় তৃতীয় হলেও অন্য রেকর্ডে অবশ্য ঠিকই শীর্ষে নিজের নামটা কাল তুলে নিয়েছেন মুশফিক। তৃতীয় উইকেটে তামিমের সঙ্গে তাঁর ১৭৮ রানের জুটিটা ওয়ানডেতেই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পার্টনারশিপের রেকর্ড, আগের রেকর্ডটা ছিল কেনিয়ার বিপক্ষে হাবিবুল বাশার ও রাজিন সালেহর করা ১৭৫ রানের জুটি। তিন বছর আগেই এই রেকর্ডটা ভাঙার খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন মুশফিক, খুলনায় এনামুল হককে সঙ্গী করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তাঁদের জুটিটা ভেঙে যায় ১৭৪ রানে, আউট হয়েছিলেন মুশফিকই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে øাতকোত্তর করা মুশফিকের এই ইতিহাসটা অজানা থাকার কথা নয়। তবে ক্রিকেটদেবতা বোধ হয় এতটা অবিবেচক নন। তাই বাংলাদেশ দলে তাঁর সবচেয়ে নিষ্ঠাবান ভক্তকে আরেকটি সুযোগ তিনি দিয়েছেন, যেটা কাজে লাগাতে ভুল করেননি মুশফিক।
বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তিনটি জুটির দুটিতেই আছে মুশফিকের নাম। শুধু কি তাই, নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সাকিবকে নিয়ে গড়া ১৪৮ রানের জুটি, একই সিরিজে মাহমুদ উল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে ১৩৪ রানের জুটি, কিংবা বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটায়- সাম্প্রতিক সময়ে বেশির ভাগ বড় জুটিগুলোতেই দায়িত্বশীল অবদান মুশফিকের। যা বাংলাদেশ দলের মিডল অর্ডারকে দিয়েছে স্থিরতা, যে কারণে স্কোরবোর্ডটাও দেখায় স্বাস্থ্যবান। সব মিলিয়ে মুশফিক পরিণত হয়েছেন দলের আস্থার প্রতীক, ধারাবাহিকতার অন্য নাম।
স্কুলজীবনে বাংলা পরীক্ষায় ভাব সম্প্রসারণ কিংবা রচনা লেখার বিষয় হিসেবে ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি’ আসে হরহামেশাই। উত্তরপত্রে উদাহরণ হিসেবে  মুশফিকের নামটা দিলে পরীক্ষক বোধ হয় নম্বর কাটবেন না!
এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.