মনের পশু প্রবৃত্তি ত্যাগই ঈদুল আযহার মূল চেতনা

0

এডভোকেট সালহ্উদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু :: শান্তি, সৌহার্দ্য ও ত্যাগের মহিমা নিয়ে এবারও পবিত্র ঈদুল আযহা সমাগত। মুসলিম উম্মাহ্র বৃহত্তম দুটি ধর্মীয় উৎসবের অন্যতম হচ্ছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। ঈদুল আযহা মুসলিম ধর্মাবলম্বিদের সবচেয়ে বৃহৎ একটি ধর্মীয় উৎসব। এদিনে ঈদগাহে ধনী, দরিদ্র এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদুল আযহার নামায আদায় করবে। আর সকলে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অহংকার ভূলে মিলিত হওয়ার দিন। আল্লাহ্ তা’য়ালা এ দিবসটি কে মুসলমানের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট দিন হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশে এ উৎসব কুরবানি বা বকরা ঈদ নামে পরিচিত।

ঈদুল আযহা মূলত আরবী বাক্যাংশ। আর এর অর্থ হলো ত্যাগের উৎসব। ঈদুল আযহার উদ্দেশ্য হলো স্রষ্টার সন্তুুষ্টি, ভালোবাসার নিদর্শন ও আত্মত্যাগ। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর অসীম ভক্তি সর্বোচ্চ ত্যাগের সদিচ্ছায় আল্লাহ্ তা’য়ালা সন্তুষ্ট হয়ে হযরত ইব্রাহিম (আঃ) কে আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ তার প্রাণপ্রিয় আপন শিশুপুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) কে কুরবানি করার স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে আল্লাহ্র আদেশে হযরত ইসমাইল (আঃ) কে কুরবানি করার উদ্যত হয়েছিলেন, যা সর্বকালের মানব ইতিহাসে ত্যাগের সর্বোচ্চ নিদর্শন,  কিন্ত আল্লাহর অশেষ কুদরতে শিশুপুত্র হযরত ইসমাইল (আঃ) এর পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানি হলো। সে থেকে প্রতিবছর হিজরি সালের ১০ জিলহজ্ব ঈদুল আযহার দিনে হালাল পশু কুরবানি করার প্রথা চালু হয়। এ ঘটনাকে স্মরণ করার নিমিত্তে সারা মুসলিম বিশ্ব এ দিবসটি ভাবগাম্ভীর্যের মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে থাকে।

হযরত আদম (আঃ) এর সময় হতে কুরবানির যে ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীতে সময়ে নবী, রাছুলগণ আল্লাহ নামে কেবল তাঁরই সন্তুুষ্টির জন্য কুরবানির পথ প্রদর্শন করে গেছেন। প্রতিবছর ঈদুল আযহা সারা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে কুরবানির অফুরন্তু আনন্দ সওগাত ও ত্যাগের উজ্জ্বল মহিমা নিয়ে উপস্থিত হয়। ভোগলিপ্সু সমাজ বাস্তবতার এ ঈদ আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের দিশারি। প্রতিবছর মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় অনুষ্ঠান পবিত্র হজের পরেই গৃহপালিত চতুষ্পদ পশু কুরবানি দিয়ে ঈদুল আযহা উদযাপন করা হয়।

কুরআন মজিদে আল্লাহ বলেছেন, সুতরাং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ কায়েম করো এবং কুরবানি করো (সুরা আল-কাওসার, আয়াত-২)। নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, কুরবানির দিনে আল্লাহ্র কাছে রক্ত প্রবাহিত (কুরবানি করা) অপেক্ষা প্রিয়তর কোন কাজ নেই। অবশ্যই কেয়ামতের দিন  কুরবানি পশু তার শিং, পশম ও খুর সহ হাজির হবে। কুরবানি রক্ত মাটিতে পতিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ্র দরবারে কবুল হয়ে যায়। তাই তোমরা প্রফুল্ল মনে কুরবানি করো (তিরমিজি, ইবনে মাজা)।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, আমার কাছে পশুর রক্ত, মাংস, হাড় পৌঁছেনা, পৌঁছে তোমাদের অন্তরের তাকওয়া। যার উপর যাকাত ওয়াজিব, তার উপর ঈদুল আযহা উপলক্ষ্যে পশু কুরবানি ওয়াজিব। সামর্থ্যবান মুমিনগণ আল্লাহ্র সন্তুুষ্টি ও নৈকট্য লাভের জন্য শরিয়তে নির্দেশিত পন্থায় তাদের কুরবানি পশু আল্লাহ্র নামে উৎর্সগ করে। প্রতিকি অর্থে পশু কুরবানি করা হয়। মূলতঃ কুরবানি দিতে হয় মানুষের সব রিপুকে, কাম, ক্রোধ, লোভ, লালসা, মোহ, পরনিন্দা ও পরশ্রীকাতরতা। হালাল অর্থ দিয়ে ক্রয়কৃত পশু কুরবানির মাধ্যমে সম্পন্ন হতে হয়।

ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কুরবানির মাংস এক ভাগ গরিব ও মিসকিনদের, এক ভাগ আত্মীয় স্বজনদের এবং এক ভাগ নিজেদের জন্য। ভোগে সুখ নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। কিন্তু কুরবানির এই মর্মবাণী আমরা ভূলে গিয়ে পার্থিব চিন্তায় আছন্ন হয়ে ত্যাগের সাধনার চেয়ে ভোগ বিলাস ও অপচয়ে মত্ত হয়ে পড়েছি। কুরবানির মধ্যে যে উৎসর্গের মহিমা রয়েছে, তার অধিক বড় হয়ে উঠে ভোজনের উৎসবে। গরিব ও মিসকিনদের মাঝে বিতরণ না করে, প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মাংস ভক্ষণ এবং পুরো বছরের জন্য ফ্রিজে মওজুদ রাখা ইদানিং আমাদের রীতিতে পরিণত হয়েছে। এটা কোনভাবে কাম্য নয়। দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী দরিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে। সামর্থ্যবানদের এদিনে সে সব অন্নহীন ও নিরন্ন মানুষদের কথা ভাবা উচিত।

মানবতার সেবা প্রকৃত ধর্ম। পুর্ণাঙ্গ বিধান ইসলাম সাম্য ও শান্তির গান, তাই আরেকবার সুরলহরী তুলি, কুরবানির মাংস ধনী ও দরিদ্রদের মাঝে সমহারে ভাগাভাগির মাধ্যমে। মানুষের দুটো প্রবৃত্তি রয়েছে- একটি পশুপ্রবৃত্তি অপরটি বুদ্ধিবৃত্তি। পশুপ্রবৃত্তিকে সংযত রেখে বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োগ মানুষ যখন জীবনকে সুন্দর, সুষ্ঠু ও সুপথে পরিচালিত করে, তখন একে আদর্শ জীবন বলে অভিহিত করা হয়। আদর্শ জীবন প্রতিষ্ঠা কল্পে মানুষকে অনেক সময় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। ত্যাগ, উৎসর্গ বা কুরবান হচ্ছে পশু প্রবৃত্তিরই বিসর্জন। আমাদের মনের ভিতর যে পশু মনোবৃত্তি তার অবসানই কুরবানির মূল চেতনা ও আদেশের অংশ।

আরবি শব্দ ‘তাকওয়া’র অর্থ হলো আল্লাহ্ভীতি। কুরবানি মুসলমানদের ‘তাকওয়া’র শিক্ষা দেয়। ইসলাম একটি পুর্ণাঙ্গ দ্বীন। এতে আকাইদ, ইবাদত, মুয়ামালাত, মুআশারাত, আখলাক ইত্যাদি সকল বিষয় অর্ন্তভূক্ত আছে। কুরবানির অর্থনৈতিক দিকেরও অনেক তাৎপর্য রয়েছে। কুরবানিকে কেন্দ্র করে পশু পালন, বিক্রয়, জৈব সার উৎপাদন, চামড়া শিল্প বিকাশ ঘটে। যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অনন্য অবদান রাখে।

আমাদের ইসলামের সঠিক পথ অনুসরন করতে হবে। আল্লাহ্ সবাইকে কুরবানির মর্মকথা ও ঈদুল আযহার প্রকৃত লক্ষ্য, উদ্দ্যেশ্য ও তাৎপর্য অনুধাবন করার শক্তি প্রদান করুক। সমগ্র মুসলিম উম্মাার কল্যাণে নিজেদের যেন উৎর্সগ করতে পারি। কুরবানিকে ঘিরে কোন প্রতিযোগিতা বা প্রদর্শনবাদিতা নয়, আত্মত্যাগের মহিমাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। লৌকিকতা নয়, পরষ্পরের প্রতি সহমর্মিতা, সহযোগিতা, বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের আত্মত্যাগের মহিমায় প্রোজ্জল হয়ে উঠুক পবিত্র ঈদুল আযহা।

ঈদের ছুটিতে অধিকাংশ লোক নাগরিক ক্লান্তি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার লক্ষ্যে গ্রামীণ জনপদে নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়ার তীব্র আকুতি নিয়ে ছুটে যাবে প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে। প্রতিবছর বাস, ট্রেন, লে র টিকেট চলে যায় কালোবাজারিদের দখলে। যার কারণে ঐ বাধ্য হয়ে উচ্চমূল্যে কালোবাজারিদের হতে টিকেট কিনতে হয়। এ ব্যাপারে সরকারের নির্লিপ্ততা কাম্য নয়।

ঈদুল আযহার সময় দেশের বিভিন্ন সড়ক, মহাসড়কে পশুর হাট বসার কারণে রাস্তায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় যা বাড়তি দুর্ভোগ সুষ্টি করে। ফলে দুরদুরান্তের যাত্রীদের ভোগান্তির সীমা থাকে না। তাই সরকারের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যানজট নিরসনের উদ্যেগ নিতে হবে এবং সার্বিক নিরাপদ যাত্রা সুনিশ্চিত সহ সার্বিক নিরাপত্তা রক্ষার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘরমুখো যাত্রীরা নির্বিঘে বাড়ি যেতে চায়। আশাকরি যোগাযোগ মন্ত্রীর সাঁড়াশি তৎপরতায় বাড়ি ফেরার দুর্ভোগ প্রশমিত হবে।

প্রতিবারের মতো দেশে লাখ লাখ পশু কুরবানির মাধ্যমে ঈদুল আযহার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে পশুর হাট জমে উঠতে শুরু করেছে। ঈদ সামনে রেখে চাঁদাবাজ, মাস্তান ও সন্ত্রাসীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পশুর হাটের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। তারা যেন জনজীবনের নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটাতে না পারে সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে।

ঈদুল আযহায় সারাদেশে প্রচুর পশু কুরবানি হয়। সকলের একান্ত কর্তব্য পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করা। যত্রতত্র পশু জবাই করার প্রবণতা পরিহার করা। সকল পঙ্কিলতা ভূলে পরস্পরের প্রতি সহযোগিতা, বন্ধুত্ব, মমতা, ভ্্রাতৃত্ব ইত্যাদির মাধ্যমে ঈদুল আযহার আদর্শকে আমরা সমুন্নত রাখতে পারি আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন সে তওফিক যেন আমাদের দান করেন।এ পবিত্র ঈদুল আযহার দিনে সকলের প্রত্যয় হোক একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ।

এডভোকেট সালহ্উদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.