লড়াই হবে ‘নৌকা’ ও ‘ছাতা’ প্রতীকের মধ্যে

0

সিটি নিউজ,চন্দনাইশ : জাতীয় একাদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী না থাকলেও ২০ দলীয় জোটের শরীক দলের প্রার্থী ছাতা প্রতীকের কর্ণেল অলি আহমদের সাথে মহাজোট প্রার্থী নৌকা প্রতীকের আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে মূলত ভোটযুদ্ধ হবে।

১৯৭৬ সালে চন্দনাইশ থানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ আসনে ১৯৭৯ সালে ১৮ ফেব্রেুয়ারি দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মত প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি’র প্রয়াত ব্যারিস্টার মাহবুবুল কবির চৌধুরী। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রদূত নির্বাচিত হলে ১৯৮১ সালে উপ-নির্বাচনে এলডিপি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৮৬ সালে ৭ মে তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেন জাতীয় পার্টির ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহমেদ। নির্বাচনের ৩ বছরের মাথায় ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে পুনরায় ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহমেদ জয়লাভ করেন। একই আসনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে, একই বছর ১২ জুন ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে কর্ণেল অলি জয়লাভ করেন।

৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চন্দনাইশ আসন ছাড়াও সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসন থেকেও নির্বাচিত হন। ২টি আসনে জয়লাভ করার কারণে চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আসন ছেড়ে দিলে, তাঁর সহধর্মিনী মমতাজ অলি উপ-নির্বাচনে চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আসনে আ.লীগের প্রার্থী আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করে জয়লাভ করেন।

পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় কর্ণেল অলি নির্বাচিত হন। একই সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের মেয়াদের শেষ দিকে কর্ণেল অলি বিএনপি থেকে বেরিয়ে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এলডিপি থেকে ‘ছাতা’ প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করেন। কর্ণেল অলি বিএনপি থেকে বেরিয়ে এলডিপি গঠন করার পর চন্দনাইশ বিএনপি অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে। ফলে বিএনপি’র ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত চট্টগ্রাম-১৪ আসনটিতে বিএনপি’র রাজনীতি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে।

কর্ণেল অলি বিএনপি’র কাঁধে ভর করে নিজের দল এলডিপি’কে শক্তিশালী করে নিজেই ৯ম সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি মহাজোটের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পরিকল্পনা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সভাপতি মনোনীত হয়ে বেশ কিছুদিন দায়িত্ব পালনও করেন।

স্থানীয় আ.লীগের প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে সে পদ থেকে বাদ পড়ে যান কর্ণেল অলি। শত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, অবশেষে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্ব মুহুর্তে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কারণে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে তাঁর মনোনয়ন নিশ্চিত হয়। প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে নির্বাচনী লড়াই হবে আ.লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সাথে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী কর্ণেল অলি আহমদ তথা ‘ছাতা’ প্রতীকের। কর্ণেল অলি প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে চাকুরী ছেড়ে ১৯৭৮ সালে রাজনীতিতে যোগদান করেছিলেন।

গত ২৫ নভেম্বর বিকালে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গণভবন থেকে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন মহাজোট প্রার্থী আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়ে দীর্ঘ ৫ বছর এলাকার ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। রাজনৈতিক জীবনে গাছবাড়ীয়া সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, ১৭ বছর উপজেলা আ.লীগের সভাপতি, দক্ষিণ জেলা আ.লীগের যুগ্ম সম্পাদক, জাতীয় পরিষদ সদস্যসহ মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে দেশের স্বাধীকার আন্দোলনের জন্য কাজ করে ব্যাপক অবদান রেখেছেন। তিনি ১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম এ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী কর্ণেল অলির সাথে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন। একই আসনে কর্ণেল অলি এ আসনটি ছেড়ে দিলে তিনি কর্ণেল অলি’র সহ ধর্মীনি মমতাজ অলির সাথে উপ-নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। ইতোমধ্যে প্রতীক পেয়ে মাঠ পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের নিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন নজরুল ইসলাম।

বিগত ৫ বছরে নজরুল ইসলাম চৌধুরী ২শ ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে শঙ্খের ভাঙ্গন প্রতিরোধে শঙ্খ নদীর দু’পাড়ে ব্লক ¯’াপন, শঙ্খ নদীর উপর ৫ম সেতু খোদারহাট ব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের জন্য উম্মুক্ত করেছেন। এলাকার প্রতিটি সড়ক সংস্কার, ৫টির অধিক কলেজে ৪ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ, বিভিন্ন উ”চ বিদ্যালয়ে একাডেমিক ভবন নির্মাণসহ সম্প্রতি ৩শ ৭৭ কোটি টাকা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৩৫ বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে তার চেয়েও বিগত ৫ বছরে বেশী উন্নয়ন হয়েছে। মহাজোট সরকারের এ উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখতে তাকে পুনরায় নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানান। নজরুল ইসলাম চৌধুরী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় আ.লীগের নেতা-কর্মীদের মাঝে উৎসহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে প্রচার-প্রচারণা এগিয়ে চলছে।

প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকে ৯জন প্রার্থী তাদের প্রতীক নিয়ে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রাখলেও চোখে পড়েনি ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের প্রার্থী মো. জানে আলম নিজামী’র চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)’র আলী নেওয়াজ খানের কুড়েঘরের পোস্টার, ব্যানার এবং কোন ধরনের মাইকিং বা প্রচার-প্রচারণা দৃশ্যমান হয়নি বলে স্থানীয়রা জানান।

তাছাড়া বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মোমবাতি প্রতীক নিয়ে স.উ.ম আবদুস সামাদের পক্ষে নৌকা ও ছাতা প্রতীকের সাথে সমান তালে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত থাকলেও হালকাভাবে প্রচারণায় মাঠে ছিল, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল, ইসলামিক আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কাস্তে, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের ফুলের মালা।

চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির চেয়ারমান ড. কর্ণেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম (ছাতা), আ.লীগের প্রার্থী নজরুল ইসলাম চৌধুরী (নৌকা) ছাড়াও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব স.উ.ম আবদুস সামাদ (মোমবাতি), ইসলামীক আন্দোলন বাংলাদেশের মো. দেলোয়ার হোসেন সাকী (হাতপাখা), ইসলামীক ফ্রন্ট বাংলাদেশ দক্ষিণ জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জানে আলম নিজামী (চেয়ার), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, চট্টগ্রাম জেলা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুল নবী (কাস্তে), তরিকত ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আলী ফারুকী (ফুলের মালা), বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আলী নেওয়াজ খান (কুঁড়েঘর), জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আবু জাফর মো. অলি উল্লাহ (লাঙ্গল) প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্ধিতা করছেন। তবে মূল লড়াই হবে ‘নৌকা’ ও ‘ছাতা’ প্রতীকের মধ্যে। এ দ্বি-মূখী লড়ায়ে আঘাত হানতে চাচ্ছেন মোমবাতি প্রতীকের প্রার্থী স.উ.ম আবদুস সামাদ।

চট্টগ্রাম-১৪ আসন একটি আলোচিত সংসদীয় আসন হিসেবে চিহ্নিত। এ আসনে নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও কর্ণেল অলি আহমদ হেভিওয়েট দু’প্রার্থীর পাশাপাশি আরও ৭ জন নবীন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসনে কর্ণেল অলি আহমদ এবং নজরুল ইসলাম চৌধুরী দু’জনেই প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ। এ বারের নির্বাচনে দু’জনের জয়-পরাজয়ের উপর নির্ভর করবে আগামী দিনের রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারিত হবে। তাছাড়া নবীন প্রার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ন্যাপ, বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্টের প্রার্থীদের বাসস্থান এ আসনে নয়। এ আসনে ২ লক্ষ ৪৯ হাজার ৪৩ জন ভোটারের মধ্যে ১ লক্ষ ৩০ হাজার ৪০২ জন পুরুষ, ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৬৪১ জন মহিলা ভোটার রয়েছে। ২ টি পৌরসভা, ১৪ টি ইউনিয়নে ১০৪টি কেন্দ্রে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.