ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় লক্ষাধিক জেলে পরিবার

0

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন, কক্সবাজার : কক্সবাজার জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলে অন্তত ৭০ হাজার জেলে পরিবার রয়েছে। এছাড়াও মাছ বহন,লোড আনলোড, প্রক্রিয়াজাতকরণ সহ মৎস্যের সাথে বিভিন্ন ভাবে জড়িত রয়েছে আরো অন্তত ত্রিশ হাজার নারী পুরুণ শ্রমিক। জেলে এবং এসব শ্রমিক পরিবার মিলে অন্তত লক্ষাধিক পরিবার এবার ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

গত ২০ মে থেকে হঠাৎ করে সাগরে একটানা ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। আসন্ন ঈদের আগে এভাবে সাগর থেকে মাছ আহরণ বন্ধ করায় তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে ফিশিং বোট মালিক সমিতি ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা মিটিং, মিছিল, প্রতিবাদ সভা ও মান বন্ধন করেছে।

এব্যাপারে বলেন, হঠাৎ করে গত ২০ মে থেকে সাগরে একটানা ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। তাতে এবারই প্রথম সাধারণ নৌকাও রয়েছে নিষেধাজ্ঞার আওতায়। আসন্ন ঈদের আগে এভাবে সাগর থেকে মাছ আহরণ বন্ধ করে দেয়ায় অন্তত লক্ষাধিক পরিবারে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবারের আয়ের একমাত্র ভরসা ছিল সাগরে মাছ শিকার।

আর মাছ বহন, ধোয়া, বাছাইকরণ, ফিশিং বোট ও যানবাহনে মাছ লোড-আনলোড, প্রক্রিয়াজাত করণসহ মৎস্যের সাথে দৈনিক শ্রমিকরা কাজ করতো । সেটি বন্ধ হওয়ায় তারা একদিকে হয়ে পড়েছেন কর্মহীন, অন্যদিকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদের আনন্দ থেকেও তারা বঞ্চিত হতে চলেছেন। এর চেয়েও বড় সমস্যা হলো বেশির ভাগ মৎস্য শ্রমজীবিদের শিশু সন্তানেরা অনাহারে আছেন।

রোজার দিনে পরিবারের কর্তারা রোজা রেখে অভুক্ত থাকলেও অনেক পরিবারে ইফতারি আর সেহরী খাওয়ার অর্থও নেই। ঋনের কিস্তি দিতে না পেরে তারা বিভিন্ন ব্যক্তি ও এনজিওর কাছে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। পাশাপাশি ঋণের টাকার জন্য চাপ দেয়ায় তাদের পারিবারিক জীবনে অশান্তি বিরাজ করছে। প্রতিটি জেলে পরিবার ও শ্রমজীবি পারিবারে ৬ থেকে ১০ জন সদস্য রয়েছে। চলমান রোজার দিনে এসব পরিবারের সদস্যদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সরকারী নিষেধাজ্ঞা রোজার ঈদের পর থেকে ঘোষণা করা হলে এরকম দুর্বিষহ অবস্থায় পড়ত না তাদের জীবন, এমনটাই জানিয়েছেন মৎস্য ব্যবসায় সংশ্লিষ্টরা। এসব পরিবারের মাঝে বড় ধরনের বিপর্যয় হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

কক্সবাজার সদর উপজেলা লোড আনলোড মৎস্য শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি আসাদুল হক আসাদ বলেন, কক্সবাজার বিএফডিসি ঘাট, ফিশারী ঘাটের আশপাশের বিভিন্ন ফিশিং আড়তে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ হাজার শ্রমিক কাজ করতো।

সাগরে ৬৫দিন মাছ শিকার বন্ধ। তাই তারা বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেক পরিবার ঋন গ্রস্ত। বর্তমানে এসব মানুষগুলোর এমন কোন সহায় সম্পদ নেই যেগুলো বিক্রি পারবে, বিক্রি করে সংসার চালাতে পারতো, কিন্ত এখন সেই পথও রুদ্ধ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি কামনা করেছেন; সরকারী ভাবে সহায়তা দিলে অন্তত ঋণের বোঝা থেকে নিষ্কৃতি না পাক, পরিবারের ভরণ-পোষণসহ আসন্ন ঈদ উদযাপন করতে পারেন। মানবিক দিক বিবেচনা করে সরকারের হস্তক্ষেপ ও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

কক্সবাজার সদর উপজেলা নারী মৎস্য শ্রমিক ঐক্য জোট, আহবায়ক লিপি আকতার বলেন, কক্সবাজার বিএফডিসি ঘাট, ফিশারী ঘাটের আশপাশের বিভিন্ন ফিশিং আড়তে প্রতিদিন ১৫ শতাধিক নারী শ্রমিক কাজ করেন। যারা প্রকৃতভাবে মাছের সাথে জড়িত। মাছ থাকলে আমাদের ভাত আছে। এখন মাছ শিকার বন্ধ, অভাব অনটন চলছে।

স্থানীয় রেজাউল করিম বহদ্দার এর মতে, তার পরিচালানাধীন প্রতিটি ফিশিং বোটে মজুদকৃত কাচামাল বরফ, খাদ্য,তেল সব মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা করে আছে। সাগরে যেতে না পারায় লোকবল নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে বলে জানান তিনি।

জিয়াউল হক নামের এক জেলে জানান, সামনে ঈদ কিভাবে করব? টাকা না পেলে পরিবারের সন্তান সন্ততিদের নিয়ে ঈদকেনা কাটা বন্ধ সহ সবাইকে অর্ধাহারে অনাহারে থাকতে হবে । সরকারের উচিৎ আমাদের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা অন্তত ২০ দিন শিথিল করা। আমরা অন্তত মুসলমানদের সব বৃহৎ ধর্মীয় উৎসবটা যাতে হাসিমুখে উদযাপন করতে পারব।

নুরুল হাকিম নামের আরেক জেলে জানান, আমাদের লেখাপড়া ও শিক্ষাদীক্ষা খুবই কম। আমরা একমাত্র সাগরে মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোন পেশা নেই। আমরা খুবই দরিদ্র। আমাদের জমানো কোন টাকা পয়সা নেই। সবাই অনেকটা দিনে এনে দিনে খায়। এই ঈদে আমাদের ছেলে মেয়েদের নতুন কাপড় কিনে দিতে হবে। কিন্তু সাগরে এক নাগাড়ে ৬৫দিন মাছ ধরা বন্ধ করায় আমাদের মতো জেলে পরিবারে শুরু হয়েছে কান্নার রোল। লেগে আছে অভাব অনটন।

কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী নেতা জয়নাল আবেদীন জয়নাল বলেন, আমরাও এই দেশের নাগরিক। আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশের কোন পেশার মানুষের উপর এত বড় অন্যায় করা হয়নি। যে কোন মানুষ কাজ না করে একদিন, একসপ্তাহ বসে থাকতে পারে কিন্তু আমরা শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে একাধারে ৬৫দিন অলস সময় কাটানো একেবারেই অসম্ভব।

ক্রেতারা জানান, এই রমজানের দিনে সাগরের মাছ কোথাও মিলছে। ফলে মিঠা পানির মাছের দামও আকাশ চুম্বি। ক্রেতা সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে । মিঠা পানির মাছের পাশাপাশি বেড়ে গেছে শুটকির দামও।

কক্সবাজার জেলা মৎস্য অধিদপ্তর অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার ৮ উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৮ হাজার ৩৯৩ জন। ততমধ্যে সদর উপজেলায় ৭ হাজার ১২০জন, মহেশখালী উপজেলায় ১১ হাজার ৪৪২ জন, চকরিয়া উপজেলায় ৩ হাজার ৮৫৭ জন, টেকনাফ উপজেলায় ৭ হাজার ৮৮৩ জন, উখিয়া উপজেলায় ৩ হাজার ৩৯২ জন, রামু উপজেলায় ২ হাজার ২৭৩ জন, পেকুয়া উপজেলায় ৩ হাজার ৯৬৭ জন ও কুতুবদিয়া উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ৮ হাজার ৪৫৯ জন। এসব জেলেরা সরকারী প্রণোদনা ভাতার আওতায় রয়েছে বলে সুত্র জানায়। তবে আরো অন্তত অনিবন্ধিত জেলে ও মৎস্যের সাথে জড়িত শ্রমজীবি অন্তত ৬০ থেকে ৭০ হাজার পরিবারের ভবিষ্যত কি হবে, তারা সরকারী সহযোগীতা পাবে কি পবে না সে বিষয়ে কোন তথ্য মিলেনি।

এদিকে কক্সবাজার মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা এস এম খালেকুজ্জামান বলেন ,এই নিষেধাজ্ঞা সরকার কতৃক প্রদত্ত,জারিকৃত নির্দেশ কোনভাবে তুলে ফেলা সম্ভব না। এই কমিটির সভাপতি মাননীয় জেলা প্রশাসক। জেলেদের দাবী নিষেধাজ্ঞা ২০ দিন পর করা হোক, এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, কেউ এরকম দাবী করে লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা সেইটা উর্ধতন কতৃপক্ষের নিকট পৌছানোর ব্যব¯’া করব।

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.