নগরের প্রবৃদ্ধির অন্যতম স্তম্ভ দরিদ্র জনগোষ্ঠী 

0

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান : দ্রুত নগরায়ণ এ সময়ের অন্যতম বাস্তবতা। ২০৫০ সালের মধ্যে নগর জনসংখ্যা গ্রামীণ জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ভোগের নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন, জনদুর্ভোগ, বিশৃঙ্খল ও বিপন্ন পরিবেশ, প্রাসাদ ও বস্তির সহাবস্থান, পরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে অবিরাম ও নিষ্ফল কথা চলা কী নেই আমাদের নিরন্তর বেড়ে ওঠা নগরগুলোয়। একদিকে নগর বাংলাদেশ লাফিয়ে লাফিয়ে বড় হচ্ছে, অন্যদিকে কেন নগরায়ণ পরিকল্পিত পথে হচ্ছে না তা নিয়ে দুশ্চিন্তা, মাথাব্যথা ও হতাশাও বাড়ছে। কারণ এটা খুবই স্পষ্ট, নগরায়ণ প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করলেও বাড়তি আয়কে সুষম ও স্বস্তির জীবনমানে রূপান্তর করছে না। বরং বৈষম্য, অবাসযোগ্যতা ও বিশৃঙ্খলা দিন দিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে।

কেন নগরায়ণের এ দশা আজকের বাংলাদেশে? এর উত্তর খোঁজার চেষ্টার অভাব আছে তা কিন্তু নয়। অনেক কারণ চিহ্নিতও হয়েছে। কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গির কিছু মারাত্মক ত্রুটি বা প্রকারান্তরে কারচুপি আলোচনায় তেমন প্রাধান্য পায় না। অথচ বেহাল নগরায়ণের অন্যতম যোগসূত্রগুলো এ দৃষ্টিভঙ্গির কারচুপিতেই নিহিত।

প্রথম কারচুপিটি হচ্ছে নগর দরিদ্রদের আমরা কীভাবে দেখছি বা মূল্যায়ন করছি। আমলা মহল, ধনী ব্যবসায়ী মহল এমনকি একাডেমিক মহলেও বেহাল নগরায়ণের অন্যতম কারণ হিসেবে নগর দরিদ্রের আধিক্যকে দেখার প্রবণতাটিই প্রবল। এক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গিটা এ রকম যে, নগর দরিদ্ররাই সুষ্ঠু নগরায়ণের পথে বড় বোঝা বা প্রতিবন্ধক। কারণ তাদের মাধ্যমেই নগর জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু বিষয়টি বাস্তবে উল্টো। নগরের প্রবৃদ্ধির অন্যতম স্তম্ভই দরিদ্র জনগোষ্ঠী। পোশাক শিল্পের কথাই যদি ধরা হয়, তাহলে শ্রমিকরাই কিন্তু এখানে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করছেন। উদ্যোক্তাকে অস্বীকারের উপায় নেই, তবে কম মজুরির শ্রমিকরাই এখানে প্রধান সেলিং পয়েন্ট। অন্যান্য খাতের কথাও যদি ধরা হয়, তাহলে ঘুরে-ফিরে কম পারিশ্রমিকের শ্রমিকরাই প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করছেন।

এক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গিগত একটি ফাঁকি পরিলক্ষিত হয়। কেননা সস্তা শ্রম যেখানে আমাদের প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালক, সেখানে সস্তা শ্রম দেয়া শ্রমিকদের ন্যূনতম জীবনমান উন্নতিকে অস্বীকার করা হচ্ছে। এর পরিণতি হিসেব সার্বিকভাবে নগরায়ণটাও ব্যাহত হচ্ছে। কেননা যেসব খাত এখানে অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা ছিল, যেমন গণপরিবহন, স্বল্প আয়ের টেকসই আবাসন, নগর স্বাস্থ্য—এ খাতগুলোই পরিকল্পনা বা বরাদ্দের বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাই বলছি, আমরা দরিদ্রদের দেখার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটা কারচুপি করছি। বলা হচ্ছে, নগরের বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ অনেক বেশি দরিদ্র মানুষের উপস্থিতি। অথচ নগরের দুরবস্থার অন্যতম কারণ দরিদ্রদের নাগরিক সুবিধার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য না দেয়া। যেমন গণপরিবহন ব্যবস্থা। এর উন্নয়নে শুধু দরিদ্ররা লাভবান হবে তা নয়, বরং সুষম নগরায়ণের জন্যও এটি প্রয়োজন। কম খরচে আবাসন ব্যবস্থা সুষম নগরায়ণের জন্য ইতিবাচক। নগরের বিশৃঙ্খলার অন্যতম কারণ নগর পরিকল্পনার ঘাটতি। এখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিন্তু শক্তিশালী স্বার্থ তাদের অর্থনৈতিক সুবিধার জিনিসগুলোকেই শুধু প্রাধান্য দিচ্ছে। সুষম নগরায়ণের বিষয়গুলোকে সত্যিকার অর্থে সামনে আসতে দিচ্ছে না। পরিবহন, আবাসন থেকে শুরু করে কোথায় কোন ধরনের রাস্তা তৈরি হবে, তা তারা ঠিক করছে। চট্টগ্রামে গিয়ে দেখবেন যে ফ্লাইওভার নির্মাণে প্রচুর খরচ করা হয়েছে, কিন্তু ওগুলোর ব্যবহার খুব কম। অথচ বিভিন্ন মহল্লার রাস্তার ভয়ংকর দুরবস্থা। তাই নগরায়ণের বেহাল দশার জন্য দৃষ্টিভঙ্গির কারচুপি অন্যতম কারণ।

অথচ দরিদ্রদের দায়ী না করে আমরা বরং কিছু পদক্ষেপ নিতে পারতাম। বাংলাদেশকে সস্তা শ্রমের অবস্থান থেকে উৎপাদনশীল শ্রমের জায়গায় যেতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা, ভালো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ আমরা এ বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিচ্ছি না এবং নগর দারিদ্র্যের বিষয়টিকে মানতে চাচ্ছি না। ‘দারিদ্র্য’ শব্দটি বললে আমাদের উন্নয়নের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এ ধরনের উন্নাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা সহজেই ঢুকে পড়ছি। অথচ আমরা সস্তা শ্রমের ভিত্তিতে প্রবৃদ্ধি করছি। তা পোশাক শিল্প হোক বা অভিবাসন খাত। আমরা রেমিট্যান্সের কথা বলছি, কিন্তু যারা এটি পাঠাচ্ছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সামাজিক পর্যায়ের ব্যবহার মোটোই শোভন নয়।

সস্তা শ্রমকে যদি উৎপাদনশীল শ্রমে রূপান্তর করতে হয়, তাহলে নগরের সার্বিক বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিতেই হবে। দরিদ্রকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণে দেখতে চাইলে নগর স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেয়া জরুরি। যদি প্রশ্ন করা হয়, নগর স্বাস্থ্য কী? কিংবা এখন তো অনেক ব্যয়বহুল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা রয়েছে, তার পরও আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এত অনাস্থা কেন? প্রশাসনের হর্তাকর্তা থেকে শুরু করে আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠী ভারতে চিকিৎসা নিতে যায়। এভাবে প্রচুর রেমিট্যান্স আমরা হারাচ্ছি। আমরা ব্যয়বহুল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করছি; এক ধরনের চাকচিক্য তৈরি হচ্ছে, কিন্তু আমাদের যে পরিমাণ জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের সবার জন্য সুষম স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি। নগর দরিদ্রদের জন্য প্রয়োজন প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। সেখানে এক ধরনের বেহাল দশা বিদ্যমান। দ্রুত নগরায়ণের ফলে আরো একটা বাড়তি সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাহলো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের মূল চিন্তাটা ছিল গ্রামীণ সমাজকেন্দ্রিক। তাছাড়া নগর স্বাস্থ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুপস্থিত। গ্রামীণ স্বাস্থ্যের মতো নগর স্বাস্থ্যে তাদের উপস্থিতি নেই, যার ফলাফল নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুরবস্থা।

সস্তা শ্রম থেকে আমরা যদি উৎপাদনশীল শ্রমভিত্তিক অর্থনীতি তৈরি করতে চাই, তাহলে আমাদের তিনটি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করতে হবে। প্রথমত. নগর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে। দ্বিতীয়ত. বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণকে কার্যকর জায়গায় আনতে হবে। তৃতীয়ত. সহজলভ্য আবাসনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

দরিদ্ররা কিন্তু এরই মধ্যে ব্যয় করছে। ওরা প্রতি বর্গফুট হিসেবে যে ভাড়া দিয়ে থাকছে, তা মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্তের খরচের তুলনায় বেশি। সুতরাং তারা যে খরচ করছে না, তা নয়। কিন্তু তাদের প্রয়োজনের দিকে বিনিয়োগকারী সংস্থা কিংবা রাজউকের কথাই যদি ধরা হয়, তারা মনোযোগ দিচ্ছে না। পূর্বাচল থেকে শুরু করে অন্যান্য আবাসিক প্রকল্পে স্বল্প মূল্যের আবাসনের ব্যবস্থা রাখার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

নগর স্বাস্থ্য, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও আবাসন—এ তিন জায়গায় আমাদের নজর দেয়া প্রয়োজন। মধ্যম আয়ের দেশে এমনি এমনিতেই রূপান্তরিত হওয়া যাবে না। উৎপাদনশীল শ্রমের ভিত্তি তৈরির মাধ্যমেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার ভিত্তি তৈরি হবে। আমাদের তেল বা স্বর্ণের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই, ঘুরে-ফিরে আমাদের শ্রমভিত্তিক অর্থনীতিকেই দাঁড় করাতে হবে। উৎপাদনশীল শ্রমে যেতে হলে এ তিন বিষয়ে আমাদের নজর দেয়াটা খুব জরুরি।

মনে রাখতে হবে, দৃষ্টিভঙ্গির কারচুপি আর নগর পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে নগর বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। নগরের বিনিয়োগগুলো অপরিকল্পিতভাবে হচ্ছে। তার জন্যই বিশৃঙ্খলা। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে নগরের বেহাল অবস্থার কারণ অধিক গরিব লোকের উপস্থিতি। তাদের আমরা বোঝা হিসেবে দেখছি। দৃষ্টিভঙ্গির কারচুপিটাকে পাল্টানো দরকার।

দৃষ্টিভঙ্গির দ্বিতীয় কারচুপি হচ্ছে নগরের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ঘিরে; যাদের মূলত কোনো ক্ষমতা নেই। এজন্য একে আমরা দৃষ্টিভঙ্গির কারচুপি বলব। আমাদের শত শত প্রকল্প হচ্ছে, নাম দেয়া হচ্ছে স্থানীয় সরকার বাজেট। কিন্তু এ প্রকল্পগুলো সরাসরি স্থানীয় সরকারের কাছে যায় না। স্থানীয় এলাকায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোই খরচগুলো করে। স্থানীয় সরকারকে সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে আমাদের অনীহা। দুঃখজনকভাবে আমলাতন্ত্রের পক্ষ থেকে এক ধরনের অনীহা তো আছেই। জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও অনীহা বিদ্যমান। আমরা বলি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষম প্রতিষ্ঠান নয়, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির কারচুপি বা মিথ আমরা চালিয়ে আসছি।

নগর স্থানীয় সরকার এক ধরনের স্ববিরোধী এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। নগর স্থানীয় সরকারগুলোকে তাদের আয়ের জায়গাগুলোকে ঠিক করতে দেয়া হচ্ছে না। যেমন কর থেকে তাদের একটা অংশ পাওয়ার কথা; উচিতও। ওগুলো করতে দিচ্ছি না। আমার বলছি, আপনারা হচ্ছেন স্বশাসিত, আপনাদের নিজের খরচে চলতে হবে—এটা একটা কারচুপির জায়গা। নিজেদের খরচে চলার কথা বলছি, কিন্তু এর জন্য তাদের আয়ের যৌক্তিক জায়গাগুলো, যেমন ভূমিকর এগুলো থেকে তাদের বঞ্চিত করছি।

নগর দরিদ্রদের নিয়ে যেমন দৃষ্টিভঙ্গির কারচুপি রয়েছে, তেমনি নগর স্থানীয় সরকারদের নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির কারচুপি বিদ্যমান। অসংখ্য প্রকল্প হচ্ছে। কিন্তু প্রকল্পের সঙ্গে চাহিদার সামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে না। আজ দেখা যাচ্ছে, কেউ রাস্তা ঠিক করছে, কাল ওটা খুঁড়ে অন্য কেউ অন্য কোনো কাজ করছে। এ অবিরাম ধারা চলছে। প্রকল্পগুলো চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ার অন্যতম কারণ নগর সরকারকে অকার্যকর রাখা। যে জায়গাগুলোয় তাদের কাজ করার সুযোগ থাকা উচিত কিংবা যে জায়গাগুলোয় তাদের কাজ করা উচিত, সেখানে এক ধরনের আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের বাইরে রাখা হয়েছে।

সুতরাং এ দুই জায়গাতেই আমাদের বড় ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার। আমরা যদি নগর দরিদ্রকে বোঝা হিসেবে না দেখে প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখি তাহলে নগর স্বাস্থ্য, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, স্বল্প মূল্যের আবাসন ও গণপরিবহনের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এগুলো যদি ঠিক হয়, তাহলে সুষম নগরায়ণও ঠিক হতে থাকবে। কারণ খুব ধনী শহরেও কিন্তু বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

এ দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির কারচুপির মধ্যে আমাদের বিশৃঙ্খল নগরায়ণটা এগোচ্ছে। কাগজে-কলমে প্রবৃদ্ধির মাত্রা বাড়ালেও সস্তা শ্রমের জায়গা থেকে উৎপাদনশীল শ্রমভিত্তিক অর্থনীতি যদি তৈরি করা না যায়, তাহলে প্রবৃদ্ধিও আর বাড়বে না। তাই নগর স্থানীয় সরকারকে অন্যতম গুরুত্বের জায়গায় নিয়ে আসতে হবে।

নগর দরিদ্রদের মধ্যেও একটা বিভাজন রয়েছে। দরিদ্রের একটা অংশ রয়েছে হতদরিদ্র। তাদের বিষয়টা ভিন্নভাবে দেখা দরকার। স্বল্প আয়ের মানুষকে বাধ্য হয়েই স্বল্প পরিসরের মধ্যে বাস করতে হচ্ছে। সেখানে তারা কিন্তু স্পেস ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে নানা ধরনের উদ্ভাবনী চিন্তার সমাবেশ ঘটিয়েছে। এক্ষেত্রে তৃতীয় পর্যায়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে। তাছাড়া নগরের ভূমির ব্যবহার অত্যন্ত অদক্ষ এবং অপচয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে করা।

আমরা যখন নগর দরিদ্রদের জন্য স্বল্প মূল্যের আবাসনের কথা বলছি, তখন কিন্তু এটা বলছি না যে, তাদের প্রত্যেকের নিজেদের বাড়ি থাকতে হবে। নগর দরিদ্রদের জন্য ভাড়াভিত্তিক যে আবাসন ব্যবস্থা, তা ঘিরে একটা অশুভ চক্র তৈরি হয়েছে। যেনতেন করে তাদের ঘরগুলো তৈরি করা হচ্ছে, কিন্তু সেখানে কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা নেই। এ জবরদস্তিমূলক রেন্টাল হাউজিং ব্যবস্থা কোনো ধরনের নিয়মের তোয়াক্কা করে না। দরিদ্রদের রেন্টাল হাউজিংয়ের এ জায়গায় নজর দেয়া প্রয়োজন।

ঢাকা শহর ঘিরে জমির সদ্ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকায় অকল্পনীয়ভাবে জমির অপচয় করা হয়। ঢাকা শহরে বিভিন্ন অফিস রয়েছে, যেখানে বড় পরিমাণে জায়গার অপচয় করা হচ্ছে। যেখানে হয়তো খামার আছে, পশু-পাখি পালন করা হচ্ছে। ঢাকায় প্রচুর খাসজমি রয়েছে, যেগুলোকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করা দরকার। কমিউনিটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরির মাধ্যমে সবাই লাভবান হবে, জমির মালিকও লাভবান হবে, তার জমির মূল্য বেড়ে যাবে। কিন্তু নগর জমির সদ্ব্যবহারের জায়গায় আমরা তেমন নজর দিচ্ছি না। তাছাড়া এর সঙ্গে সম্পৃক্ত গোষ্ঠীগুলো খুব শক্তিশালী জায়গায় রয়েছে।

অন্যদিকে সুষ্ঠু নগরায়ণ না হওয়ার বিষয়টিও জমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। নগরে পরিসর বা খোলা জায়গার প্রয়োজন রয়েছে। সুষম নগরের জন্য খোলা পরিসরের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অথচ এদিকে আমাদের নজর নেই। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে দরিদ্রবান্ধব নগরায়ণ তো হচ্ছেই না বরং বলা যায়, দরিদ্রবিরোধী নগরায়ণ হচ্ছে। এর মাধ্যমে দুভাবে ক্ষতি হচ্ছে। একদিকে যেমন সুষম নগরায়ণ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে এর কারণে সস্তা শ্রম থেকে উৎপাদনশীল শ্রমভিত্তিক অর্থনীতি তৈরির কাজটিও হাতে নেয়া যাচ্ছে না। কারণ দরিদ্রবিরোধী নগরায়ণ যে শুধু দরিদ্রদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে তা নয়, এটি এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করছে, যেখানে গণপরিবহন, সুষম আবাসন, শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও নগর স্বাস্থ্য উপেক্ষিত থাকছে। অথচ বর্তমানে এমন একটা সময় চলছে, যখন দরিদ্রদের শ্রমের ভিত্তিতে নগরায়ণের প্রবৃদ্ধি টিকে আছে। এ স্ববিরোধিতা থেকে শুধু নীতিনির্ধারক নয়, একাডেমিক জগেকও মুক্ত হতে হবে। নগরায়ণ নিয়ে একপেশে গবেষণা হয়ে আসছে। যেমন সুন্দর গ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে বিশৃঙ্খল নগর—এ ধরনের চিন্তা থেকে গবেষণাগুলো করা হচ্ছে।

কিন্তু নগরায়ণের গবেষণা হওয়া উচিত, কীভাবে নগর অর্থনীতি টিকিয়ে রেখে বা আরো সম্প্রসারণ করে সুষম নগরায়ণ করা যায়। অথচ শহরের মধ্যে কীভাবে হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ অতীতকে ধরে রাখব—এ নিয়ে আমরা গবেষণায় মনোযোগী। দরিদ্রবিরোধী নগরায়ণের যে মানসিকতা, সেখান থেকে বের হয়ে আসলে সুষম নগরায়ণ হবে, নগর দরিদ্রদের সমস্যাগুলোকে সুষ্ঠুভাবে দেখা যাবে এবং সস্তা শ্রম থেকে উৎপাদনশীল শ্রমভিত্তিক অর্থনীতি তৈরি করা সম্ভব হবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.