চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলের দুরত্ব 

0

জুবায়ের সিদ্দিকীঃ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর দুরত্ব বেড়েই চলছে। জানা গেছে, জোটের ঘোষিত কর্মসুচি বাস্তবায়ন না হওয়া, বৈঠকে শরিক নেতাদের অনুপস্থিতি এবং বিভিন্ন বক্তব্যে জোটের ঐক্য যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়তে পারে।

তবে ১৪ দলীয় নেতারা বলছেন, তারা ঐক্যবদ্ধ আছেন। আদর্শিক প্রশ্নে তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতণায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রশ্নে জোট অটুট আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের বিভিন্ন ইস্যু এবং রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে প্রতিটা দলের নিজস্ব স্বকীয় অবস্থান আছে। শরিক দলগুলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করতেই পারে। রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতেও স্বতন্ত্র অবস্থান ব্যক্ত করতে পারে, যদি তা আওয়ামী লীগ অবস্থানের বিরুদ্ধেও যায়।

১৪ দলের নেতারা বলছেন বর্তমান সরকার গঠনের পর থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটের শকির দলগুলোর দুরত্ব বাড়তে থাকে। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে শরিক দল জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ অন্যান্য দলের নেতারা বলে আসছিলেন, ১৪ দল অটুট আছে, থাকবে। রাজনীতি, নির্বাচন ও সরকারের একসঙ্গে কাজ করবে। কিন্তু নতুন সরকারে জোটের কেউ স্থান না পাওয়ায় তাদের অবস্থান বদলাতে শুরু করে।

সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জোট শরিকদের সংসদে শক্তিশালী বিরোধী ভুমিকা পালনের আহবান জানানো হয়। তখন শরিক নেতা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু অভিন্ন সুরে বলেন, একসঙ্গে জোট করেছি, একসঙ্গে নির্বাচন করেছি, বিরোধী দলে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। এমনকি সরকার গঠন নিয়ে বা জোট শরিকদের ভুমিকা কী হবে তা নিয়েও তাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি বলেও দাবী করেন তারা।

ইনু বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ এককভাবে বিজয় উৎসব পালনের ফলে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেন এমন ঘটলো তার উত্তর আওয়ামী লীগ নেতারাই দিতে পারবেন। তিনি বলেন, জাসদ সরকারকে সমর্থন দেবে নাকি বিরোধী দলে থাকবে তা সম্পুর্ন দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়।
সন্ত্রাস দুর্নীতি জঙ্গিবাদ ও মাদক রোধে জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বার বার কর্মসুচি ঘোষনার কথা বললেও জোটের পক্ষ থেকে কর্মসুচী দেওয়া হয়নি। আবার ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কর্মসুচী ঘোষনা করেও তা স্থগিত করা হয়েছে।

গত এপ্রিল ও মে মাসে অনুষ্ঠিত জোটের বেশ কয়েকটি বৈঠকে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতা রাশেদ খান মেনন, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, হাসানুল হক ইনুকে দেখা যায়নি। জাতীয় নির্বাচন নিয়েও আলোচনা করতে দেখা গেছে বাংলাদেশ জাসদকে। সর্বশেষ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে সরকারের সঙ্গে সরাসরি বিপরীতমুখী অবস্থানে বক্তব্য দেন রাশেদ খান মেনন। এসব বক্তব্য জোটের অনৈক্যের আলামত কিনা জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য এবং ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন,’১৪ দল অটুট আছে, অটুট থাকবে।

এদিকে চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলের দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, জোটের ঘোষিত কর্মসুচী বাস্তবায়ন না হওয়া, বৈঠকে শরিকদলের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিত না থাকা, সরকারে ১৪ দল নেতাদের মুল্যায়ন না হওয়া এবং বিপরীতমুখী বক্তব্য-বিবৃতিতে এই দুরত্ব তৈরী হয়েছে। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দলের প্রতিটি কর্মসুচীতে ১৪ দলের নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি দেখা যেত। ওই সময় চট্টগ্রামে ১৪ দলের সমন্বয়কারী ও নগর আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রতিটি কর্মসুচীতে মহাজোটের সরিকদলের স্থানীয় নেতারা উপস্থিত থাকতেন। বিরোধী দলের বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজপথে সরিকদলের নেতাকর্মীরা থাকতেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে শরিক দল জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ অন্যান্য দলের নেতারা বলে আসছিলেন, ’১৪ দল অটুট আছে, থাকবে। সরকারে জোটের কেউ স্থান না পাওয়ায় তাদের অবস্থান বদলাতে শুরু করে। সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জোট শরিকদের সংসদে শক্তিশালী ভুমিকা পালনের আহবান জানানো হয়। এর জবাবে তখন শরিক নেতা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু অভিন্ন সুরে বলেন, একসঙ্গে জোট করেছি, একসঙ্গে নির্বাচন করেছি, বিরোধী দলে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না’।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় তথ্যমন্ত্রী থাকার রেকর্ড রয়েছে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মন্ত্রীসভায় স্থান পান। সেই থেকে টানা সাত বছর তথ্য মন্ত্রনালয়ে ছিলেন। একই অবস্থা ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের। তিনিও প্রায় সাত বছর মন্ত্রী ছিলেন। যদিও তিনি এক মন্ত্রনালয়ে ছিলেন না।

এবারের মন্ত্রীসভা গঠনের আগে অনেকে ধারনা করেছিলেন, হাসানুল হক ইনু এবং রাশেদ খান মেনন অবধারিতভাবে মন্ত্রীসভায় থাকবেন। কিন্তু সরকারের মন্ত্রী সভায় ১৪ দলের কাউকে রাখা হয়নি। এর পর থেকেই ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বক্তৃতা-বিবৃতিতে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যার প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের রাজনীতিতে। এর আগে চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন সংগ্রামে নগর জাসদের সাধারন সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন বাবুল, ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারন সম্পাদক শামসুদ্দিন খালেদ সেলিম, সাম্যবাদী দলের অমুল্য বড়ুয়া, গণ আজাদী লীগের মাওলানা নজরুল ইসলাম আশরাফী, জাতিয় পার্টি (মঞ্জু) আজাদ দোভাষ, তরিকত ফেডারেশনের কাজী মো: আহসানুল মোরশেদ কাদেরী, ন্যাপ নেতা মিটুল দাশগুপ্ত প্রমুখ উপস্থিত থাকতেন। বর্তমান সরকার গঠনের পর তাদের সেভাবে জোটগত ইস্যুতে দেখা যাচ্ছে না।

জানতে চাইলে, ’ওয়াকার্স পার্টি’র একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,’ ১৪ দল এখনো সরকারের সঙ্গে আছে। এ সরকারে মুল্যায়ন না হওয়ায় কিছুটা অভিমান তো থাকবে’। তার মতে, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে দুরত্ব নেই। অপরদিকে জাসদ (আম্বিয়া) কার্যকরী সভাপতি ও চট্টগ্রাম বোয়ালখালী থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মঈন উদ্দিন খান বাদল গত ২৫ জুন বলেছেন,’ আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কালুরঘাট সেতুর সৎগতি না হলে তিনি সংসদ থেকে বের হয়ে যাবেন’।

রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহলের মতে, রাজনৈতিক দল হিসেবে ১৯৭২ সালে আত্বপ্রকাশের পর ভাঙ্গাগড়ার মধ্যেই চলছে জাসদ। জিয়ার শাসনামলে জাসদ দুইবার ভাঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল বেরিয়ে আলাদা জাসদ গঠন করেন। এরপর বেরিয়ে গিয়ে বাসদ গঠন করেন খালেকুজ্জামান ও আ.ফ.ম মাহবুবুল হক। সেই জাসদ এখন কয়েক খন্ড হয়ে টিকে আছে।

আশির দশকে এরশাদের সময়ে জাসদ আবার ভাঙ্গে। এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা আ.স.ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজ আলাদা জাসদ গঠন করেন। রব সামরিক সরকার এরশাদের মিত্র হিসেবে ১৯৮৮ সালে সব দলের বর্জন করা নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা হন। এরপর বিএনপি ক্ষমতায় এলে শাহজাহান সিরাজ বিএনপিতে যোগ দেন।

২০১৬ সালের ১২ মার্চ জাসদের জাতীয় কাউন্সিলে ফের দুইভাগ হয় দলটি। হাসানুল হক ইনু ও শিরীন আকতার নেতৃত্বাধীন অংশটি ইসির স্বীকৃতি পাওয়ার পর জাসদ (আম্বিয়া-বাদল) বাংলাদেশ জাসদ নামে স্বীকৃতি চায়। তবে তাদের নিবন্ধন দেয়নি ইসি। যে কারনে পুনরায় দ্বিখন্ডিত হওয়া জাসদ তার গুরুত্ব হারিয়েছে ।

চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অভীন্ন ইস্যুতে ইদানিং ১৪ দলের নেতাকর্মীদের একমঞ্চে দেখা যাচ্ছে না। বিষয়টি স্বীকার করে মহানগর জাসদ (ইনু) সাধারন সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জসিম উদ্দিন বাবুল বলেন,’ আওয়ামী লীগের নেতারা না ডাকায় তাতে অনৈক্যের কিছু দেখা যাচ্ছে না। এ ছাড়া দলটি কাউন্সিলকে সামনে রেখে খুঁব ব্যস্ত। যে কারনে হয়তো ১৪ দলের সঙ্গে বসা হচ্ছে না। তিনি বলেন,’ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ বিরোধী অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মানে আমরা সরকারের সঙ্গে ছিলাম, আছি এবং থাকব। সরকারে ১৪ দল নেতাদের মুল্যায়ন করা না করার সঙ্গে জোটের সম্পর্ক নেই।

প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালে ২৩ দফার ভিত্তিতে ১৪ দলীয় জোট গঠন করা হয়। সে সময় থেকেই তৎকালীন বিএনপি জামায়াত সরকারের নানা অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে জোটের শরিকরা। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন করে তারা। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ১৪ দলকে মন্ত্রীসভায় রাখা হয়। এর পরের সরকারেও ছিলেন তারা। তবে এর শরিক দলের কাউকে মন্ত্রীসভায় স্থান দেওয়া হয়নি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টিকে আওয়ামী লীগ পাঁচটি আসন ছেড়ে দেয়। জাসদ (ইনু ) পায় দুটি এবং বাংলাদেশ জাসদ (আম্বিয়া) পায় একটি।

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.