চন্দনাইশে রবি ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস পালন

0

মো. দেলোয়ার হোসেন, চন্দনাইশঃ এমন ঘনঘোর বরিষায় বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল কিংবা বসন্তের আগমনী বার্তায় সবার আগে যে নামটি মনে আসে, তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলার ঋতু, প্রকৃতি আর গ্রামীণ সৌন্দর্যকে সার্থকভাবে কাব্য, গীতির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন তিনি। বাঙালি সংস্কৃতিতে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে কবিগুরুর ছোঁয়া লাগেনি।

জীবন চলার পথের সব অনুভূতিকে বৈচিত্র্যময় ভাষা আর শব্দের মাধ্যমে কালি ও কলমে প্রতিষ্ঠা করেছেন। প্রেম, রোমাঞ্চ, ভালোবাসা কিংবা বিরহ প্রকাশে তিনি যেন অপরিহার্য। তাই তো বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির মহীরুহ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নিজের অসামান্য সৃষ্টি কর্মের মধ্য দিয়ে বিশ্বকবির খেতাবটিও অর্জন করেছেন এ কবি।

রবীন্দ্রনাথের কারণেই বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালি জাতির পরিচিতির বিস্তৃতি ঘটেছে। তিনিই বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভুবনে কালজয়ী চিহ্ন রেখে গেছেন বলে তার সৃষ্টিকর্ম বার বার বাঙালি জাতির মানসপটে নিয়ে আসে তাকে। আশি বছরের জীবন সাধনায় মৃত্যুকে নিয়ে গভীর জীবন তৃষ্ণায় তিনি লিখেছেন, ‘মরিতে চাহি না আমি, সুন্দর ভুবনে/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ তার হাত ধরেই বাংলা সাহিত্য নতুন রূপলাভ করে।

গল্পে, উপন্যাসে, কবিতায়, প্রবন্ধে, নতুন সুরে ও বিচিত্র গানের বাণীতে, অসাধারণ সব দার্শনিক চিন্তাসমৃদ্ধ প্রবন্ধে, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতি সংলগ্ন গভীর জীবনবাদী চিন্তা জাগানিয়া অজস্র বাণী। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, কথাশিল্পী, চিত্রশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, ছোট গল্পকার ও ভাষাবিদ। তার লেখা বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’ সর্বকালের সেরা সঙ্গীত হিসেবে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত।

তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে’ অর্থাৎ দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা। ‘বাংলাদেশ’ নামের বানানটি নেওয়া হয়েছে আমাদের ওই জাতীয় সঙ্গীত থেকেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেন। তার লেখা বিশ্বের দরবারে সম্মানের আসনে পৌঁছে দিয়েছে বাংলা সাহিত্যকে। রবীন্দ্রনাথ শুধু বাঙালির নয়, বাংলাদেশ ও ভারতসহ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব বাঙালির। সবার কাছেই তিনি মানবমুক্তির বারতা নিয়ে উদ্ভাসিত।

‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম ১৯১৩ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল ফাউন্ডেশন তার এ কাব্যগ্রন্থটিকে বর্ণনা করেছিল একটি ‘গভীরভাবে সংবেদনশীল, উজ্জ্বল ও সুন্দর কাব্যগ্রন্থ’রূপে। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রিটিশ সরকারের ‘নাইট’ উপাধি লাভ করেন। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ওই উপাধি প্রত্যাখ্যানও করেন তিনি। আলোচনা, কবিতা পাঠ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা বর্ণাঢ্য আয়োজনে কবির ৭৮তম প্রয়াণ দিবস পালন করা হয় চন্দনাইশে।

গত ১০ আগস্ট সকালে চন্দনাইশ সদরস্থ কাশেম মাহবুব উচ্চ বিদ্যালয় মিলনায়তনে চন্দনাইশ সংগীত নিকেতনের উদ্যোগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৭৮তম প্রয়াণ বার্ষিকী উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এড. মো. দেলোয়ার হোসেন। প্রধান অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন, থানা অফিসার ইনচার্জ কেশব চক্রবর্তী। পরে প্রতিষ্ঠানের শিল্পীদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করছে ক্ষুদে শিল্পীরা
অনুষ্ঠানে নৃত্য পরিবেশন করছে ক্ষুদে শিল্পীরা

অনুষ্ঠানে সুধীর আচার্যের নেতৃত্বে সংগীত পরিবেশন করেন, শ্যামা দেবী, নির্বাচিত বড়ুয়া, চৈতি বড়ুয়া, মাহিয়া, কাকলী সুশীল, বৃষ্টি শীল, রেশমী শীল, শফিকুল ইসলাম, প্রেমাংশু চাকমা। নৃত্য পরিবেশন করে রেশমী আক্তার, মণি শীল, শিমলা চক্রবর্তী, সুস্মিতা বড়ুয়া, চৈতি বড়ুয়াসহ শিশু শিল্পীরা। শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়।

শিল্পীরা একের পর এক গাইলেন, আজি কাঁদে কারা জয় তব হোক জয়, জগতের পুরোহিত তুমি, তুমি হে প্রেমের রবি, শুভদিনে শুভক্ষণে, সেদিন দুজনে, দুজনে এক হয়ে যাও, শান্তি পারাবার, একদিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে আলোকের পথে প্রভু, ওই মহামানব আসে হে নতুন, দেখা দিক আর বার মোরা জলে স্থলে কত ছলে, পথহারা তুমি পথিক যেনো গো, জীবনে আজ কি প্রথম এল বসন্ত, কাছে আছে দেখিতে না পাও, আমার পরান যাহা চায়, আমি কভু ফিরে নাহি চাই, সকল হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছি যারে, তুমি কে গো, সখীরে কেন, তবে সুখে থাকো, ডেকো না আমারে ডেকো না, যে ছিল আমার স্বপন চারিণী, এস এস বসন্ত ধরাতলে, এ ভালোবাসার যদি দিতে, অসীম সংসারে যার দুজনে দেখা হল মধু কামিনী, আজি মোর দ্বারে।

এ সকল গানের সাথে নাচের মাধ্যমে কবির অনুভুতি প্রকাশ করেছেন দর্শকদের মাঝে শিল্পীরা।

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.