চট্টগ্রামে বিএনপি আন্দোলন সংগ্রামে ব্যর্থ, নেতাকর্মীরা হতাশ

0

জুবায়ের সিদ্দিকীঃ চট্টগ্রামে কোনভাবেই দাঁড়াতে পারছেন না বিএনপি। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে একটি মহা-সমাবেশ করলেও এরপর আর কোন কর্মসূচী দেখা যায়নি। তবে চট্টগ্রাম বিএনপির অধিকাংশ নেতাই নাশকতাসহ বিভিন্ন মামলায় জর্জরিত। অনেকেই এলাকা ছাড়া। গত সংসদ নির্বাচনে বিরাট বিপর্যয় বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করেছিল। স্থবির হয়ে পড়েছিল চট্টগ্রাম বিএনপির রাজনীতি।

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে বিভাগীয় মহাসমাবেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি এবং কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের আন্দোলনে নামার ঘোষণায় বিএনপি ও দলের সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু এরপর তারা কোন শো-ডাউন করতে পারেনি। অনেকটা চার দেওয়ালের ভেতরই তাদের রাজনীতি সীমাবদ্ধ। শোক সভা ও মাহফিলের মধ্যে চলছে নগর বিএনপির রাজনীতি। দলের তৃণমূল পর্যায়ে যথেষ্ট কর্মী সমর্থক থাকলেও কোনভাবেই মাথা তুলে দাাঁড়াতে পারছে না দলটি।

দলটির কেন্দ্র যেমন সরকারের অনুমতি ছাড়া কোন সভা সমাবেশ করতে পারে না চট্টগ্রামেও একই অবস্থা। যেটা বিএনপি সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। দেশে দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি, ক্যাসিনো বাণিজ্যসহ অনেক রাজনৈতিক ইস্যু থাকলেও দেশের অন্যতম দ্বিতীয় প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে দলটি কোন আন্দোলন সংগ্রামই গড়ে তুলতে পারেনি। দলীয় কোন্দলের কারনেও চট্টগ্রামে বিএনপির ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থ হচ্ছে।

তবে চট্টগ্রামে সফল বিভাগীয় মহাসমাবেশ পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডের উপ-নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ায় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এলেও চট্টগ্রাম বিএনপির ডাকসাইটে নেতা মোরশেদ খানের পদত্যাগে তা নিমেশেই ফিকে হয়ে যায়। তবে চট্টগ্রামের বিএনপি নেতারা বলছেন, মোরশেদ খানের পদত্যাগে দলে প্রভাব পড়ার কোন কারণ নাই।

চট্টগ্রামে রাজনৈতিক বিশ্লেককরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বহুধাবিভক্ত বিভিন্ন জেলা-উপজেলা কমিটি এবং নেতৃত্ব সংকটের কারণে দলটির রাজপথে নামার সাংগঠনিক শক্তি কতটুকু রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এ বিষয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মাহবুবুর রহমান শামীম সিটি নিউজকে বলেন, বিভাগীয় সমাবেশের মাধ্যমে বিএনপি জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তি- দুটিই দেখাতে পেরেছে। নেতাকর্মীরা উজ্জ্বীবিত। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে শিগগিরই কেন্দ্র থেকে বড় ধরনের আন্দোলন কর্মসূচি আসবে।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন সিটি নিউজকে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই লালদিঘির মাঠে সমাবেশের অনুমতি চেয়েছি, কিন্তু বিএনপিকে সরকার ভয় পায় তাই বড় কোন জায়গায় সমাবেশ করতে দেননা। তিনি বলেন, নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। সামনের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত সবাই।

এদিকে চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দূরত্বে দু’ধারায় বিভক্ত নগর বিএনপি। ২০১৬ সালের আগস্টে ডা. শাহাদাত হোসেনকে সভাপতি, আবু সুফিয়ানকে সিনিয়র সহ-সভাপতি ও আবুল হাশেম বক্করকে সাধারণ সম্পাদক করে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির কমিটি ঘোষণা করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

কমিটি ঘোষণার এক বছর পরে ২০১৭ সালের জুলাই মাসে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব রয়েছে। নেতাদের অনুসারীদের পৃথক পৃথক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। যার কারনে সরকার বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে নামতে নেতাদের মধ্যে দ্বিমত সৃষ্টি হচ্ছে বেশী। এর ফলে চট্টগ্রাম থেকে আন্দোলন সংগ্রামের কোন কর্মসূচী দিতে মহানগর বিএনপি বার বার ব্যর্থ হচ্ছে।

চট্টগ্রামে সাবেক মন্ত্রী আব্দুল্লাহ আল নোমান নগর বিএনপির নগর কিমিটি ঘোষনার পর থেকে দলীয় কর্মকা-ে অনেকটা নিস্ক্রীয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মঞ্জুর মোর্শেদ খান দল থেকে পদত্যাগে প্রভাব পড়েছে দলীয় কর্মকা-ে। যার কারণে নগর ও দক্ষিণ জেলার সাংগঠনিক কর্মকা- অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে। মোর্শেদ খানের অনুসারীরা রাজনীতিতে এখন অনেকটা দোদল্যমান হয়ে পড়েছেন। চট্টগ্রাম নগর ও বোয়ালখালীতে বিএনপির রাজনীতিতে মোর্শেদ খানের একটি শক্তিশালী অবস্থান ছিল।

বিএনপির সহযোগী সংগঠন নগর ছাত্রদলের দীর্ঘদিন কমিটি না থাকার কারণে ঝিমিয়ে পড়েছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। ছাত্রদলের ১১ সদস্যের নগর কমিটির একজন মারা গেছেন। বাকি ১০ জনের ৯ জনই নগর বিএনপিসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বে চলে গেছেন। কার্যত নগর ছাত্রদল বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি জসিম উদ্দিনের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ এ কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি ঘোষণার জন্য তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবিরও বাস্তবায়ন হয়নি।

এব্যাপারে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসেম বক্কর বলেন, এখনো সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। অনেকেই গ্রেফতার আতংকে। তৃণমূল থেকে সংগঠনকে শক্তিশালীভাবে গড়ে তোলার কাজ করা হচ্ছে। অঙ্গসংগঠনগুলোকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।

অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি । ২০১৪ সালের এপ্রিলে আসলাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও আবদুল্লাহ আল হাসানকে সদস্য সচিব করে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরী রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ২০১৬ সালের মে মাস থেকে কারাগারে রয়েছেন। আর সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল হাসান মারা গেছেন। পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার লক্ষ্যে ৫ বছর আগে আহ্বায়ক কমিটি করা হলেও এখনো সেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। উল্টো অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আহ্বায়ক কমিটিও অস্তিত্বহীন।

দুই ধারায় বিভক্ত উত্তর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা চলছে ঢিমেতালে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের ছায়াও মাড়াতে চান না। একদিকে বিভক্তি, অন্যদিকে দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়ায় হতাশ দলের নেতাকর্মীরা। এরইমধ্যে নিস্ক্রীয় হয়ে পড়েছেন অনেকে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুবুর রহমান শামীম বলেন, উত্তর জেলার নতুন কমিটি করার চিন্তাভাবনা চলছে। এ নিয়ে থানা কমিটির নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। উত্তরের অনেক থানায় দ্বৈত কমিটি রয়েছে। এসব কমিটিকে আগে একক কমিটিতে আনতে হবে। এরপর জেলা কমিটি গঠন করা হবে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙ্গে গত ২ অক্টোবর নগর বিএনপি’র সিনিয়র সহ সভাপতি আবু সুফিয়ানকে আহবায়ক এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোস্তাক আহমদ খানকে সদস্য সচিব করে দক্ষিণ জেলা বিএনপির ৬৫ সদস্যের নতুন আহবায়ক কমিটি কেন্দ্র থেকে ঘোষনা দেওয়া হয় ।

বিএনপির কেন্দ্রীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ কমিটির অনুমোদন দেন। দক্ষিণ জেলায় দীর্ঘদিন ধরে দ্বিধাবিভক্ত সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বিগত কমিটির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী দোস্ত বিল্ডিংস্থ দলীয় কার্যালয়ে অল্পসংখ্যক নেতা নিয়ে দলীয় কর্মসূচি পালন করলেও বিগত বছরগুলোতে একবারের জন্য দেখা মেলেনি সাধারণ সম্পাদক গাজী শাহজাহান জুয়েলের। যার কারণে নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছিল।

জানা যায়, ২০১০ সালের ২০ মার্চ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সর্বশেষ সম্মেলন হয়েছিল। সম্মেলনের পর জাফরুল ইসলাম চৌধুরীকে সভাপতি ও অধ্যাপক শেখ মহিউদ্দিন আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তখন দক্ষিণ জেলার এ কমিটির বিরুদ্ধে বিএনপির অন্য একটি অংশ পাল্টা কমিটি ঘোষণা করে।

২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিধাবিভক্ত দক্ষিণ জেলা বিএনপিকে একত্রিত করতে উদ্যোগ নেন কেন্দ্রীয় নেতারা। পুনর্গর্ঠিত কমিটিতে জাফরুল ইসলামকে সভাপতি বহাল রাখা হলেও সাধারণ সম্পাদক শেখ মহিউদ্দিন আহমেদকে সরিয়ে গাজী শাহাজাহান জুয়েলকে নতুন সাধারণ সম্পাদক করা হয়। কিন্তু দলীয় কার্যক্রমে সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতি না থাকায় নেতাকর্মীরা ঝিমিয়ে পড়ে। পরে কমিটি বিলুপ্ত করে আবু সুফিয়ানকে আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়।

অবশ্য গত ৩ মে পটিয়ার হল টুডেতে দক্ষিণ জেলা বিএনপির কর্মী সমাবেশে দু’গ্রুপের রক্ষক্ষয়ী সংঘর্ষে সভা প- হয়ে যায়। এতে গাজী শাহজাহান জুয়েল অনুসারীদের হামলা চালায় বিএননি নেতা এনামুল হক এনামের সমর্থকদের উপর। হামলায় এনামসহ কমপক্ষে ৩০ জন আহত হন। এ ঘটনায় গাজী শাহজাহান জুয়েলকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়।

এ বিভাগের আরও খবর

আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.