চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগে প্রভাবশালীদের রাজত্ব

0

জুবায়ের সিদ্দিকীঃ চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীনদলের রাজনীতিতে হাইব্রিড, চামচা ও চাটুকারদের দৌরাত্ম বেড়েছে। ক্ষমতার তৃতীয় মেয়াদে এসে অনেকেই তখন বেপরোয়া। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ নাম ভাঙ্গিয়ে অনেক নেতা ও পাতি নেতা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। টেম্পু ও রিক্সা যাত্রী ছিলেন তখন অনেকে এখন প্রাডোসহ দামী গাড়ী হাঁকিয়ে চলেন রাজপথে। যেন তারা সভ্য সমাজের রাজা-বাদশা।

একজন সাংবাদিক হিসেবে অনেক নেতা ও পাতি নেতার নিউজের কমেন্ট নিতে মোবইলে ফোন করলে কেউ রিসিভ করেন, কেউ করেন না। রিসিভ করলে প্রশ্ন করলে বলেন, “কোন খানকির পোয়া কইয়েদে”। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে এক শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা বললেন, “বিতর্কিত ব্যক্তি কোথায় নেই, মন্ত্রি পরিষদওতো বিতর্কিত। এদের মুখের ভাষাও পরিবর্তন হয়ে গেছে। কতিপয় নেতার আচরণ ও মুখের ভাষায় শালীনতাও সীমা ছাড়েিয় গেছে। পত্রিকায় এদের মুখোশ উম্মোচন করলেই হবে আমার বিরুদ্ধে তামা পিতল চুরির মামলা। সাংবাদিক বা অমুক তমুক দেখার সময় তাদের তখন থাকবে না। পদ-পদবী রক্ষা করতেই এরা উঠে পড়ে লাগবে।

দেশের সর্ববৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলের নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। নিজেও ছাত্রলীগের কর্মী ও নেতা ছিলাম। কিন্তু বর্তমানে রাজনীতিকে বাণিজ্যকরণ করে একশ্রেণীর নেতা দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে বিনষ্ট করছে। ঢাকায় ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত অনেক যুবলীগ নেতা ধরা খেয়ে এখন শ্রীঘরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই কঠোর সিদ্ধান্তকে দেশবাসী স্বাগত জানিয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর এক তৃতীয়াংশ এলাকায় প্রকাশ্যে চলছে জুয়ার আসর।

বন্দর-পতেঙ্গা এলাকায় কোটি কোটি টাকার জুয়ার সাথে জড়িত স্থানীয় অনেক আওয়ামী লীগ নেতা। সরেজমিনে মাস দুয়েক আগে নগরীর বিভিন্ন এলকায তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজেই শিহরিত হয়েছিলাম। প্রভাবশালী অনেক আওয়ামী লীগ নেতা জুয়া, মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবজিসহ নানা অপকর্মে জড়িয়েছেন। কোথাও আওয়ামী লীগ বা কোথাও বঙ্গবন্ধু সাইনবোর্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন সংগঠনের নামে অনেকে দোকানদারী খুলে বসেছেন। এই দোকানদারী করে এক একজন এখন কোটিপতি। প্যান্ট শার্ট খুলে এখন মুজিব কোট পরিহিত থাকেন অনেক নেতা। শহরাঞ্চল ও মফস্বল সর্বত্রই একই চিত্র।

মফস্বলের কোন কোন উপজেলায় কোন কোন আওয়ামী লীগ নেতা এখন গডফাদার। সন্ত্রাস ও মাদেকের সাথে এরা সরাসরি সম্পৃক্ত। এভাবে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগ নামধারীরা রাজনীতিকে ব্যবসায় পরিনত করেছেন। কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যে এরা এখন ফুলে ফেঁপে উঠেছে। মুখের ভাষাও পরিবর্তন হয়েছে। নেতা কর্মীদের দেখলে গালি দিয়ে বলেন, “অডা ক’ডে থাকিস, দাম বাড়ি গেইয়ে’না তোর? আঁর লগে থাকিস”। দলের নেতাকর্মীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা এসব নেতারাই এখন সমাজের ধারক বাহক।

একটানা তিনবার ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের চট্টগ্রামের অনেক নেতা অবৈধ অর্থের ভাগাড় সৃষ্টি করায় ঘন ঘন বিদেশ গিয়ে করছেন “সেকেন্ড হোম”। কোন কোন শীর্ষ নেতা ডাবল পদবী লাভ করায় ডাবল ডেকার নেতা হয়ে মানুষকে মানুষ বলে গন্য করেন না। অবৈধ অর্থ ও প্রভাব এদেরকে অন্ধ করে তুলেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর পরিশ্রম ও দেশ গড়ার প্রত্যয়ে কর্মযজ্ঞ করছেন। দেশে প্রচুর উন্নয়ন হয়েছে এবং হচ্ছে। সরকার দেশে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। মানুষ তার সুফল ভোগ করছেন।

কিন্তু তারপরেও মানুষ যেখানে সেখানে সরকারের চৌদ্ধ গোষ্ঠী উদ্ধার করছে। সাধারণ জনগনের অভিমত, ক্ষমতাসীনদলের ইমেজ গ্রহণযোগ্যতা, আস্থা, বিশ্বাস, মানুষের মন থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। এসব ডাবল ডেকার পদবীধারী, চামচা-চাটুকাররাই বাজাচ্ছে দলের বারোটা।

আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য, দলীয় সাংগঠনিক ভিত্তি, বিশাল কর্মী বাহিনী ও সাহসী নেতাকর্মী সৃষ্টি করেছেন বঙ্গবন্ধু একদিনের নয়, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে এই বৃহৎ দল আজ শুধু দেশে নয় বিষে এক ভাল একজন ও সুনাম অর্জন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রজ্জ্বলিত এই দলের জন্য অনেকের মতো আমাদের ত্যাগ রয়েছে। যার কারনে, আওয়ামী লীগের কোন অপবাদ বা বদনাম হলে তা আমাদের গায়ে লাগে। সরকারের সুনাম ও দলীয় ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হলে আমাদের আনন্দ লাগে।

সাংবাদিকতা পেশায় যখন পেশাগত দায়িত্ব পালনে আমরা তথ্য সংগ্রহে কোন শীর্ষ নেতার কমেন্টের জন্য ফোন করলে কোন কোন অহংকারী নেতা এমনভাব করেন যেন তিনি প্রধামন্ত্রীর থেকেও প্রভাবশালী। অর্থ ও প্রভাব মানুষকে আদর্শচ্যুত করতে করতে যেন সময় লাগে না। আওয়ামী লীগ গণ মানুষের নির্যাতিত মানুষের কষ্ঠস্বর। জননেত্রি শেখ হাসিনা এই দলের জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করছেন। নেত্রী ও দলের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে যারা তৎপর তাদের চিহ্নিত করা দরকার।

আওয়ামী লীগের চট্টগ্রামে অনেক শীর্ষ নেতার সাথে তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে অনেক আগেই। দল ক্ষমতায় আসার পর থেকে অনেক নেতার গাছাড়া ভাব ও টাকার পেছনে ছুঁটাছুটিসহ নান অপকর্মের দৃশ্য জনগন প্রত্যক্ষ করছে। এ কারনে এদের কুকর্মের প্রভাব পড়ছে সরকারের ঘাড়ে। সরকার ও দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারের জনপ্রিয়তায় ধস নামছে। মানুষ বিক্ষুব্ধ হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হচ্ছে। চট্টগ্রামে বেশীরভাগ শীর্ষ নেতা প্রায় সব সময় চামচা-চাটুকার বেষ্টিত থাকেন। যার কারনে সাধারণ মানুষ বা কোন ফরিয়াদি তাদের কাছে যেতে বিড়ম্বনা ও কষ্টে পড়েছেন।

ক্ষমতাসীন দলের এমন অনেক সংসদ সদস্য আছেন যারা অতীতে আওয়ামী লীগের কেউ ছিলেন না। অন্য দল বা শুধুমাত্র বুর্জোয়া হওয়ার কারনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। এসব এমপি দলীয় কোন কর্মকা-ে নেই। “এমপি বলয়” সৃষ্টি করে এসব এমপিদের পর পর তিনবার নির্বাচিত হওয়াতে তাদের রয়েছে গাছাড়া ভাব । আওয়ামী লীগে এখন হাইব্রিড, চামচা-চাটুকারদের দৌরাত্ম যে দলকে অক্টোপাসের মত গিলে খাচ্ছে।
চট্টগ্রামে অনেক এমপি আছেন, নিজ এলাকার নেতাকর্মীদের সনাক্ত ও চেনার জন্য লোক নিয়োগ করে রেখেছেন। আওয়ামী লীগের দলীয় ভাবমূর্তি বিনষ্ট ও সুনাম নষ্টের নষ্টদের বিচরণের কারনে ত্যাগী নেতারা মূল্যায়ন হচ্ছে না। রাজনীতির মানচিত্রে নষ্টদের উন্মাদনা ও পদচারনা রাজনীতির পরিবেশকে বার বার প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতারা রজানীতিতে এখন কোনঠাসা হয়ে আছেন। দলের জন্য যাদের ত্যাগ, রক্ত, অবদান রয়েছে তাদেরকে আজ রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না। এখন মাঠ দখল কর আছে ডিগবাজী দেওয়া, হাইব্রিড, চামচা-চাটুকার। এসব চিহ্নিত সুবিধাভোগীরা সক্রিয় শহর থেকে মফস্বল পর্যন্ত সর্বত্র। এমপি বলয় ও নেতাদের দাপট রাজনীতির স্বাভাবিক পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছে। সরকারের বারোটা বাজাচ্ছে কতিপয় মুখোশধারী নেতা। দলের স্বার্থকে ত্যাগ করে নিজেদের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। যে কারনে দল ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। দলের ভাবমূর্তি গোল্লায় যাচ্ছে।

সরকারীদলে অংশগ্রহন যেন টাকা কামানোর মেশিন। যে যার মতো যেখানে সেখানে দোকানদারী খুলে বসেছেন। যেন দেশটা তাদের বাপ দাদার তালুক। অবৈধভাবে প্রভাব খাটিয়ে ক্ষমতাসীনদলের অনেক নেতা শুধু রাজনীতির মাঠেই নয়। সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, সমিতি, সিবিএ, ইউনিয়নসহ সর্বত্র সুবিধাভোগীদের দাপট ও অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ।

বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করা এসব নেতা-পাতিনেতারাই এখন রাজনীতির নিয়ন্ত্রক। কেউ সিবিএ দখল করে ট্রেড ইউনিয়ন চালাচ্ছে। কেউ এসোসিয়েশন বা সমিতি দখল করে দখলকারীর রাজত্বে হরিলুট করছে ফ্রী ষ্টাইলে। বর্তমানে রাজনীতিকে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেই এক একজন কোটিপতি। সেদিন তৃণমূলের এক নেতা ক্ষোভের সাথে বললেন, “এতনি ফেতনি নেতা অইয়ে, মাইনষরে মানুষ তারা ন’কয়। ক্ষমতাতো চিরস্থায়ী ’ন। ক্ষমতার’তুন গেলে পাবলিকে তারারে কি গরিব অ’নে কন।” এই অভিব্যক্তি শুধু তৃণমূলের নয়, সাধারণ মানুষেরও।

এ বিভাগের আরও খবর

আপনার মতামত লিখুন :

Your email address will not be published.