আলোর দিশারি আলহাজ্ব এয়াকুব আলী চৌধুরী

0

এডভোকেট সালাহউদ্দিন আহমদ চৌধুরী লিপু:: প্রসিদ্ধ সাধক হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) এর পূণ্যভূমি, ঐতিহাসিক দেয়াঙ পাহাড়ের পাদদেশে এবং চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা উপজেলার অর্ন্তগত শস্য শ্যামলা বটতলী গ্রামে এক শুভ লগ্নে জন্ম গ্রহণ করেন আলহাজ্ব এয়াকুব আলী চৌধুরী। যিনি এয়াকুব মিয়া হিসেবে সমাধিক পরিচিত ছিলেন। এ কৃতি পুরুষের পিতা মরহুম আছদ আলী চৌধুরী দোভাষী একজন স্বনামধন্য ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি বার্মার সাথে ব্যবসা করতেন। জনাব আছদ আলী চৌধুরী দোভাষী ২২ জুলাই ১৯০৭ ইংরেজী হতে আমরণ বটতলী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট পদে দায়িত্বে ছিলেন এবং চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের তৎকালীন জুরী বোর্ডের জুরার (বিচারক) ছিলেন। বংশ পরম্পরায় আছদ আলী চৌধুরীর মৃত্যুতে তার জ্যৈষ্ঠপুত্র আবদুল আজিজ চৌধুরী ১৯২৪ ইংরেজী সনে বটতলী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট পদে ও জুরী বোর্ডের সদস্য পদে আসীন হন। শিক্ষায় এলাকাকে আলোকিত করার লক্ষ্যে নিজ অর্থায়নে ও জমিতে তিনি অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ১৯১৬ ইংরেজী সালে বটতলী শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) এম, ই বিদ্যালয় প্রতিষ্টা এবং ১৯২৭ ইংরেজীতে বটতলী পোষ্ট অফিস স্থাপন করেন। ১৯৩৫ ইংরেজী সালের ১১ নভেম্বর তিনি চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মহিলা ওর্য়াড নির্মাণ করার নিমিত্তে আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদান করেন। জনাব আবদুল আজিজ চৌধুরী বিভিন্ন অবদান রাখায় ১৯৩৭ ইংরেজী সালে তৎকালীন BRITISHসরকার কর্তৃক স্বর্ণপদকে ভূষিত হন এবং Gov.of Bangal  সরকার কর্তৃক একাধিক সনদ প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যার স্বীকৃতি স্বরূপ তৎকালীন সরকার আবদুল আজিজ চৌধুরী ডি,সি সড়ক (বটতলী-বৈরাগ) হিসেবে নামকরণ করেছে। তিনি ২১ জানুয়ারী ১৯৪৫ ইংরেজীতে পরলোক গমন করলে পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আবদুল আজিজ চৌধুরীর অনুজ মেধাবী, বিচক্ষণ ও তীক্ষè বুদ্ধি সম্পন্ন আলহাজ্ব এয়াকুব আলী চৌধুরী ১৯৪৫ ইংরেজীতে বটতলী ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি অত্যন্ত সুনাম ও দক্ষতার সাথে ১৯৭০ ইংরেজী সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট এবং পরবর্তীতে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৩৬ বৎসর কাল বটতলী ইউ, পি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ক্রীড়া সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন এবং একজন ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় ছিলেন। জনপ্রিয় এ নেতা ১৯৫৪ ইংরেজী সালে প্রত্যক্ষ নির্বাচনে তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা নুরুল আনোয়ার চৌধুরী কে বিপুল ভোটে পরাজিত করে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি একজন দক্ষ বিচারক ছিলেন। জনাব চৌধুরী অত্যন্ত ন্যায় ও নিষ্ঠার সাথে চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের তৎকালীন জুরী বোর্ডের জুরার (বিচারক) এর দায়িত্ব পালন করেন এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তিনি পশ্চিমচাল সিঃ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং আনোয়ারা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের অন্যতম দাতা সদস্য ছিলেন। উন্নয়নের মূর্ত প্রতিক এয়াকুব চৌধুরী বটতলী ইউনিয়ন পরিষদে দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে প্রচুর সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মান করেন। তৎমধ্যে উল্লেখযোগ্য হাজারী হাট সেতু ও সড়ক, আইরমঙ্গল সেতু ও সড়ক, শ্রীমতি খাল সেতু ও সড়ক, মমতাজ পাড়া সেতু ও সড়ক, সলিমুল্লাহ সড়ক ও সেতু, বটতলী-বরৈয়া সড়ক, বটতলী- আনোয়ারা সড়ক প্রভৃতি। তৎকালীন বটতলী ইউনিয়ন পরিষদের পাকা ভবনটি তিনি নির্মান করেন। পরবর্তী আমলে উক্ত ভবনটি পুনঃ নির্মাণের জন্য ভেঙ্গে ফেললেও তা অদ্যাবধি নির্মাণ হয়নি। ধার্মিক এয়াকুব চৌধুরী বটতলী শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) জামে মসজিদ, রুস্তম হাট জামে মসজিদ, নুর পাড়া জামে মসজিদ, আইরমঙ্গল (বুড়িপুকুর) জামে মসজিদ নিজে সংস্কার করেন। হলিদর পাড়া জামে মসজিদ নির্মাণে নিজস্ব জমিও অর্থায়ন করেন। ১৯৬০ ইংরেজী সালের প্রলয়ংকরী ঘুর্নিঝড়ে আনোয়ারা উপজেলায় অনেক লোকের প্রাণহানি ও ব্যাপক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। তখন অত্র এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিগেঃ খালেদ মোশারফকে তার বাসভবনে কন্ট্রোল রুম খোলার ব্যবস্থা করে দেন এবং তিনি খালেদ মোশারফ কে সাথে নিয়ে ত্রাণ কার্যে পরিচালনা করেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সমগ্র আনোয়ারায় বিদ্যুতায়নের ব্যবস্থা হয়। ১৯৭৭ ইংরেজী সালের মার্চ মাসে বটতলী ইউ,পি ভবনে আনোয়ারা বিদ্যুতায়ন অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হয়। এলাকার নিরক্ষরতা দুরীকরাণার্থে তিনি এলাকায় একটি নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। রুস্তম হাট উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে তিনি ও তার অগ্রজ আবদুল আজিজ চৌধুরী নিজস্ব জমি দান করেন। হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) মাজার শরীফের প্রধান তোরনের জন্য তিনি পরিবারিক জমি দান করেন। উক্ত মাজার শরীফ অতীতে মাটির গৃহ ছিল পরবর্তীতে তিনি ও তার ভ্রাতা আবদুল আজিজ চৌধুরী মাজার শরীফের সভাপতি থাকাকালীন সময়ে ব্যাপক উন্নয়ন করেন। তাদের পিতা মরহুম আছদ আলী চৌধুরী দোভাষী মাজার শরীফের প্রধান ফটকের পূর্ব পার্শ্বে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

অনগ্রসর এলাকার লোকজনকে অধিক শিক্ষিত করার মহৎ উদ্দ্যেশে এয়াকুব আলী চৌধুরী তার অগ্রজ আবদুল আজিজ চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বটতলী শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) এম,ই বিদ্যালয়কে নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে ১৯৪৮ ইংরেজী সালে নি¤œ মাধ্যমিক ও ১৯৫৪ ইংরেজী সালে উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিণত করেন। এই আলোকবর্তিকা উক্ত বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির প্রথম সভাপতি পদে ছিলেন এবং তিনি উক্ত পদে দীর্ঘকাল দায়িত্বে থেকে তার একেক প্রচেষ্টায় অত্র বিদ্যালয়কে সম্প্রসারন, প্রভূত উন্নয়ন সাধন এবং শিক্ষায় ও ঐতিহ্যে আনোয়ারা উপজেলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ে পরিণত করেন। তার সর্বাত্মক চেষ্টায় অত্র বিদ্যালয়ে S.S.C পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করেন। তদ্রুপ আনোয়ারা স্কুলের S.S.C পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনে অনন্য ভূমিকা রাখেন। জনাব চৌধুরী অত্র এলাকার সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার অভাব অনুভব করায় তিনি ১৯৭৬ ইংরেজী সালে প্রতিষ্ঠা করেন শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) এয়াকুবিয়া দাখিল মাদরাসা। উক্ত মাদ্রাসার জন্য জমি দান করেন তার ¯েœহের একমাত্র ভ্রাতুষ্পুত্র বিশিষ্ট দানবীর মরহুম আলহাজ্ব ছালেহ আহমদ চৌধুরী। যিনি অত্যন্ত ধর্মভীরু ও ন্যায় বিচারক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। তিনিও চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের তৎকালীন জুরী বোর্ডের জুরার (বিচারক) এর দায়িত্ব পালন করেন। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় তিনি অনন্য ভূমিকা রাখেন। জনাব ছালেহ আহমদ চৌধুরী কতৃক প্রতিষ্ঠিত বটতলী শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য নিজস্ব চল্লিশ শতক জমি, বটতলী রুস্তম হাট সড়ক সম্প্রসারন জন্য নিজস্ব জমি, হলিদর পাড়া জামে মসজিদ নির্মাণে নিজস্ব জমি ও অর্থায়ন করেন এবং বটতলীতে পল্লী বিদ্যুৎ সাব ষ্টেশনের জন্য নিজ জমি দিয়ে অনন্য অবদান রাখেন। জনাব এয়াকুব চৌধুরী বটতলী শাহ্ মোহছেন আউলিয়া (রাঃ) ডিগ্রি কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আর্থিক ভাবে সহায়তা করে বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি প্রারম্ভিক অধ্যক্ষ জিতেন্দ্র লাল দে ও কয়েকজন অধ্যাপককে নিয়ে কলেজের কার্যক্রম আরম্ভ করেন। জনাব চৌধুরী উক্ত কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। উক্ত প্রতিষ্ঠান সমূহ কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তৎকালীন সরকার বটতলী-বরৈয়া সড়কটি “এয়াকুব আলী চৌধুরী সড়ক” নামকরণ করেন।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অনন্য অবদান রাখেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত ও বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। তৎকারণে রাজাকাররা তাঁর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু হযরত শাহ্ মোহছেন আউলিয়া মাজারের পার্শ্ববর্তী বাড়ি হওয়ায় রাজকাররা পিছু হটে।

এয়াকুব আলী চৌধুরী সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন। দলমত নির্বিশেষে সকলে তাকে মুরব্বী হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। সাংগঠনিক দক্ষতা এবং যুগোপযোগী ও সময়োচিত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দূরদর্শিতার জন্য তিনি সর্বমহলে সমাদৃত ছিলেন। সকল রাজনৈতিক নেতা থেকে সকল শ্রেণীর লোক তার কাছে বুদ্ধি পরামর্শের জন্য আসতেন। তিনি ছিলেন মিষ্টভাষী, সদালাপী। তার অমায়িক ও মধুর ব্যবহারে যে কেউ অতি সহজে মুগ্ধ হতেন। বন্ধুত্ব বৎসল এই ব্যক্তি অত্যন্ত অতিথি পরায়ণ লোক ছিলেন। তার আথিতিয়তা যেজন গ্রহণ করেছেন তিনি মুগ্ধ না হয়ে পারেননি। তিনি বিশাল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। শিক্ষা, ধর্মীয় ও জনকল্যাণ কার্যে তার অবদান অনস্বীকার্য। জনহিত কার্যের জন্য এয়াকুব আলী চৌধুরী ও আবদুল আজিজ চৌধুরী কে বৃটিশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণের মেডেল, আংটি, সনদ প্রদান করেন। তাদের দুই সহোদরের বিভিন্ন সরকার হতে প্রাপ্ত প্রশংসাপত্র, সনদ, পরিদর্শন রিপোর্ট বই ও অনন্য উপহার সামগ্রী এখনো অত্যন্ত যতœ সহকারে সংরক্ষিত রয়েছ্।ে অনেক নেতা, মন্ত্রী, এম,পি, বিচারক দেশের অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন কর্ম উপলক্ষ্যে তার বাড়িতে আগমন, অবস্থান ও তাঁর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন।

আলোকিত ব্যক্তি ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় এয়াকুব আলী চৌধুরী ২০০১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১১০ বৎসর বয়সে পরলোক গমন করেন। তার স্মরণাতীত কালের বিশাল এ জানাজায় ১০/২০ সহস্্রাধিক লোকের সমাগম হয়েছিল। তাকে যে সর্বস্তরের মানুষ ভালোবাসতো এ জানাজার মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়েছে। মানুষ সেদিন এ গুণী মুরুব্বীকে হারিয়ে শোকার্ত হয়ে পড়েছিল। তার মতো একজন আদর্শবান দেশপ্রেমিক নেতাকে হারিয়ে আনোয়ারাবাসীর অপুরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

এয়াকুব আলী চৌধুরী ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা আদর্শবান পুরুষ। একটি আলোকিত সমাজ গঠনই ছিল তার মূল লক্ষ্য। কখনো তিনি তার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। নির্লোভী জনাব চৌধুরী গরীব, দুঃখী ও অবহেলিত মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু ছিলেন। বর্ণাঢ়্য জীবনের অধিকারী এই ব্যক্তি সর্বদা অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন। তার মাঝে কখনো অহংকার, গৌরব, অহমিকা, দম্ভ ছিলনা। তিনি কোনদিন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি। তার শাসনামলে বিচারপ্রার্থী জনগণ ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হননি। মরহুম স্বীয় কর্মগুণে আমাদের মাঝে আজও জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে থাকবেন। তার অবদান চির অম্লান এ পৃথিবীর লোকালয়ে। তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত এবং সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে বেহেশত নছিব করেন ষোড়শ মৃত্যুবার্ষিকীতে এই কামনা করি।

লেখকঃ- চেয়ারম্যান, এয়াকুব-ছালেহ ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম ও কলামিষ্ট।

 

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.