চট্টগ্রাম নগরীর সড়কে নরক যন্ত্রনা

0

আবদুস সাত্তার : চট্টগ্রামের নগরের প্রতিটি সড়কে নরক যন্ত্রনা ভোগ করতে হচ্ছে যাত্রীদের। একটি সড়কও ভালো নেই। সড়কের মাঝে পুকুর সমান গর্তের সৃষ্টি হয়ে বেহাল দশা। খানা খন্দক ও ময়লা আবর্জনা প্রতিটি সড়ক জুড়েই। এতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে রাস্তায় চলাচল করা মানুষ ও গাড়ি চালকদের।

তবে দুরবস্থার কথা স্বীকার করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে টেকসই রাস্তা নির্মাণ করা হবে বলে জানালেন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান।
গেল বর্ষায় বন্দরনগরীর বেশিরভাগ প্রধান সড়কে ইট, সুরকি উঠে খানা-খন্দক, বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় দুর্ভোগের অন্তনেই নগরবাসীর। ষোল শহর, বহদ্দারহাট, কাতালগঞ্জ, ইপিজেড এলাকা, কাপ্তাই রাস্তার মাথাসহ নগরীর বেশির ভাগ প্রধান সড়কের এখন বেহাল দশা। এতে করে রাস্তায় চলাচল করা জনগণকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। সে সঙ্গে রাস্তায় যানবাহন চলাচল অনেকটাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে নিম্ন মানের কাঁচামাল দিয়ে সড়ক সংস্কার, ঠিকাদার ও জনপ্রতিনিধিদের গাফলতির কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ মানুষের।

পরিকল্পিতভাবে রাস্তাগুলো নির্মাণ না করা ও সিটি কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অনেকটা দায়সারাভাবে কাজ করার কারণে এ অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন সিটি কর্পোরেশন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। রাস্তার ওপর পানি জমে থাকা বন্ধ করা না গেলে এ সমস্যার কোনভাবেই সমাধান সম্ভব নয় বলে জানান নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার।

এদিকে বাকলিয়া এক্সেস রোড  নির্মান কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কথা নয়, কাজে বিশ্বাসী জানিয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, নগর রক্ষা বাঁধ, চার লেনের শাহ আমানত সেতু সংযোগ সড়ক, বাকলিয়া এক্সেস রোড, প্রশস্ত সিরাজদৌলা রোড, প্রশস্ত বাদুরতলা-কাপাসগোলা-চকবাজার সড়ক আজ স্বপ্ন নয়, এগুলো বাস্তব করে তুলেছি। ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে, বেধিবাঁধ নির্মাণ, খালের মুখে স্লুইস গেট নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অন্ধকার থেকে আলোর মুখ দেখবেন এখানকার নগরবাসী । পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও বড় আশীর্বাদ হয়ে ওঠবে সড়কগুলো।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতায় ৯শ’ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার সড়কের পিচ উঠে বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা জানান, খানাখন্দে ভরা এসব রাস্তায় এখন যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে আছে তীব্র যানজট।

এমনিতেই সারা বছর হয় ওয়াসা, না হয় টিএন্ডটি কিংবা গ্যাস- এসব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের খোঁড়াখুঁড়ি লেগেই আছে। আছে আবার নগরীর প্রধান সড়কজুড়ে উড়াল সেতু নির্মাণের কাজ। তার ওপর অতি সাম্প্রতিককালের বৃষ্টি- জোয়ারের জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম নগরীর রাস্তাঘাটের যে বেহাল দশা হয়েছে তা একমাত্র ভুক্তভোগী যারা তারাই বুঝতে পারবেন।

বর্তমানে চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটের যে জীর্ণশীর্ণ দশা তাতে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে চট্টগ্রামের রাস্তাঘাট মেরামতের জন্য কি প্রধানমন্ত্রীকেই আবারও চট্টগ্রামে এসে কড়া নির্দেশ দিতে হবে কর্তৃপক্ষকে ?

কিন্তু চট্টগ্রামে সেবাদান ও উন্নয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত অধিকাংশ সংস্থাই একে অপরের দায় বা অভিযোগ তুলে দিয়ে নিজেদের দায় দায়িত্ব শেষ করতে ব্যস্ত। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে প্রচন্ড রকমের সমন্বয়হীনতার কারণে চট্টগ্রামবাসীকে তো চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছেই, পাশাপাশি অন্য জেলা থেকে যারা চট্টগ্রামে বেড়াতে বা কাজে ভ্রমণ করছেন তারাও বিরক্ত হচ্ছেন।

অন্যদিকে চট্টগ্রামের এসব ভাঙাচোরা রাস্তাঘাটের সংস্কারের জন্য না চট্টগ্রামের রাজনৈতিক দল, না সামাজিক-সাংস্কৃতিক, না কথিত সচেতন সুশীল সমাজ কারো পক্ষ থেকেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগে কোনো গ্রহণযোগ্য গনজাগরণও সৃষ্টির চেষ্টা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম নগরী ও নগরী থেকে বের হয়ে উপজেলা বা অন্য জেলাগুলোতে যাওয়ার জন্য যেসব সড়কগুলো রয়েছে সেগুলোরও চরম বেহাল দশা।

চট্টগ্রাম মহানগরীতে সড়কগুলো নির্মাণ ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ মূলত পরিকল্পিত নগর নির্মাণে বিল্ডিংসহ অবকাঠামো উন্নয়নে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে থাকে। পাশাপাশি নতুন সড়ক নির্মাণ করে তা সিটি কর্পোরেশনের কাছে স্থানান্তর করে দেখভাল করার জন্য।

তাই স্বাভাবিকভাবেই নগরীর রাস্তাঘাট ভেঙে গেলে তা পুনঃসংস্কার করার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের ওপরই বর্তায়। অধিকাংশ সড়ক এখন চলাচলের অনুপযোগী হলেও এসব রাস্তা দিয়েই বাধ্য হয়ে চালাতে হচ্ছে যানবাহন। আর এতে করে প্রতিনিয়ত হচ্ছে দুর্ঘটনা। পাশাপাশি কমছে গাড়ির আয়ুষ্কাল। ভাঙাচোরা সড়কে যানচলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে।

নগরীর প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ বহদ্দারহাট থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়ক, আরাকান সড়ক, আগ্রাবাদ এক্সেসে রোড, বায়েজিদ বোস্তামী সড়কসহ নগরীর হেন কোনো এলাকার সড়ক নেই যা ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। বেশ কিছু সড়কে ইট ও বিটুমিন উঠে গেছে। এসব সড়কের কোথাও পিচ নেই, কোথাও সরে গেছে ইট। সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্তের। ভাঙাচোরা সড়কে যানবাহন চলতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। ৫ মিনিটের রাস্তা পার হতে সময় লাগছে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা। তীব্র যানজট লেগেই থাকে প্রতিনিয়ত।

নগরীর বহদ্দারহাট থেকে শাহ আমানত ব্রিজ পর্যন্ত সড়কের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। এ ছাড়া আগ্রাবাদ বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে ইপিজেড হয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কের অবস্থাও বেহাল। সিডিএর উড়াল সড়কের র‌্যাম্পের নির্মাণকাজের জন্য বহদ্দারহাট মোড় থেকে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা পর্যন্ত সড়ক, মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ফ্লাইওভারের কারণে সড়কটির অবস্থাও বেহাল। এ ছাড়া অক্সিজেন থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত হাটহাজারী সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি চলছে।

তবে এটি ঠিক, ওয়াসা, টিএন্ডটি, গ্যাস কর্তৃপক্ষ বা অন্য কেউ সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন সড়ক খুঁড়ে কাজ শুরুর আগেই তা মেরামতের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা সিটি কর্পোরেশনকে পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু এরপর সেসব খোঁড়াখুঁড়ির জায়গাগুলোর মেরামতের দায়িত্ব থাকে সিটি কর্পোরেশনের ওপর।

এদিকে নগরজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের খোঁড়াখুঁড়ি ও জোয়ারে পানিতে জলাবদ্ধতায় নগরীর রাস্তাঘাটে বিশাল বিশাল খানাখন্দ তৈরি হচ্ছে। এই ভাঙা রাস্তার জন্য অনেক গাড়ি নগরীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তই শুধু নয় নগরীর ভেতরেও অনেক জায়গায় যেতে চায় না। গেলেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে নিচ্ছে যাত্রীদের কাছ থেকে।

ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে গাড়ির যন্ত্রাংশও নষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে অফিসগামী যাত্রীদের শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের যেমন দুর্ভোগ বাড়ছে তেমনি অভিভাবকদেরও দুর্ভোগের শেষ নেই। চট্টগ্রাম কাপ্তাই সড়কে অবস্থিত চুয়েট থেকে নগরীতে আন্দরকিল্লা বা নিউমার্কেট পৌঁছতে স্বাভাবিক সময়ে লাগত এক থেকে দেড় ঘণ্টা যেখানে এখন কখনো কখনো ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময়ও ব্যয় হয়ে যায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।

চুয়েটে পড়ুয়া প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রুবায়েত কাদের এমনই অভিযোগ। শুধু তাই নয়, চট্টগ্রাম শহর থেকে রাঙ্গুনিয়ার বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকদেরও প্রতিদিন এমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। মূলত এ সড়কে ওয়াসা রাস্তা খুঁড়ে পানির পাইপ বসানোর কাজ করছে। কিন্তু তা অত্যন্ত ধীরগতিতে হওয়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কর্পোরেশনের অধীনে চট্টগ্রাম মহানগরীতে মোট ১ হাজার ১৭৪ কিলোমিটারের এক হাজার ৪০টি সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ৬২০ কিলোমিটার পিচঢালা সড়ক রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, নগরীর বিভিন্ন সড়ক মেরামতের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে, নিজস্ব তহবিল থেকে এসব কাজ করা হচ্ছে। আরো দেড় মাস পরে সড়কগুলো পুর্ণাঙ্গ মেরামতের কাজ শুরু করতে পারব বলে আশা করছি।

আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আশা করছি রাস্তাগুলো সংস্কারের কাজ মোটামুটিভাবে শেষ করা যাবে। বিভিন্ন সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি ও অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় নগরীর রাস্তাঘাট আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, রাস্তা মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।

 

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.