বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো

0

কারেন্ট টাইমসঃ  চট্টগ্রামে আগ্রাবাদ এক্সেস রোড়। আগ্রাবাদ বানিজ্যিক এলাকার বাদামতলী মোড় থেকে বড়পুল পর্যন্ত। দুই লেনের রাস্তা সংস্কার ও সম্প্রসারনের কাজ চলছে। ২০১৭ সালের ১৯ নভেম্বর এ কাজ শুরু হলেও দীর্ঘ ১ বছর ৩ মাসে কাজের কোন অগ্রগতি নেই। দুই লেইনের এক কিলোমিটার রাস্তাটির উন্নয়নের কাজ চলছে খুব ধীরগতিতে। উন্নয়ণের কাজ চলায় ধুলোয় সয়লাব হচ্ছে আশপাশের এলাকাগুলো। একই সাথে নির্মান কাজ চলমান থাকায় নালা বন্ধ করা হয়েছে। এতে করে দুই পাশের এলাকার মানুষের ব্যবহারের পানিতে বাড়িঘর ভেসে যাচ্ছে।

এক্সেস রোড়ের দুই পাশের ব্যবসায়ীরা ধুলোয় ও জরাজীর্ন রাস্তার কারনে তাদের ব্যবসা লাটে তুলেছেন। হাজার হাজার মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে। এলাকাবাসী কাজের গতি বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বার বার তাগাদা দিলেও কোন কাজ হয়নি। খুব মন্থর গতিতে চলছে কাজ। নিমতলা থেকে অলংকার মোড় পর্যন্ত পোর্ট কানেক্টিং রোড়ের অবস্থাও বেহাল। উন্নয়ন কাজের কোন শৃঙ্খলা নেই। যত্র তত্র গিয়ে কাজ শুরু করে আবার অসমাপ্ত রেখে অন্যদিকে কাজ শুরু করেছে। কখনো কোন স্থানে কংক্রিড বিছানো হয়েছে, কোথাও বালি দিয়ে বুলডোজার দিয়ে মাটির লেভেল ঠিক করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে এক বিকেলে এক্সেস রোড়ে গিয়ে দেখা যায়, হাইওয়ে সুইটস এর সামনে ড্রেনের কাজ চলছে। কাজ করছে মাত্র ৪ জন শ্রমিক। কোথাও ইট ভেঙ্গে কংক্রিটের কাজ চলছে। কোথাও ড্রেনের কাজ করছে গুটিকয়েক শ্রমিক। ইকুইপমেন্টও হাতেগোনা কয়েকটি।

এক্সেস রোড়ের বেহাল দশা ও জনদুর্ভোগ ঠেকাতে নগরপিতা আ.জ.ম নাছির উদ্দিন ঠিকাদারদের তাগাদা ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দিলেও কাজের কাজ হয়নি। এক্সেস রোড়ের কাজের কোন গতি না ফিরিয়ে শ্রমিকরা ড্রেনের কাজ ধরেছেন লাকী প্লাজা মার্কেট, সিঙ্গাপুর ব্যাংকক মার্কেট ও সাউথল্যান্ড সেন্টারের সামনে। সেখানেও দ্রুততা নেই। নালার জন্য বিশাল গর্ত তৈরি করে দুইদিন শ্রমিকরা উধাও। এতে করে মানুষের হাটাচলা ও যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। এক্সেস রোড়ের সংস্কার ও সম্প্রসারন কার্যক্রমে পর্যাপ্ত শ্রমিক নিযুক্ত না করায় কাজের ধীরগতিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন আশপাশের এলাকার মানুষরা। এক্সেস রোড় ও পিসি রোড় ব্যবহারকারী দুই লক্ষাধিক মানুষ অমানবিক পরিস্থিতিতে দিনযাপন করছেন।

কোন রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কষ্টকর হয়ে উঠেছে। প্রায় দেড় বছর ধরে উন্নয়ন কাজ চলছে পোর্ট কানেক্টিং রোড়ে। অনেক ব্যবসায়ী এলাকা ছেড়েছে। আগ্রাবাদ এক্সেস রোড় থেকে পিসি রোড় হয়ে অলংকার পর্যন্ত। উভয় পাশে ঘনবসতিপুর্ন এলাকা আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনী, টিএন্ডটি কলোনী, হাজীপাড়া, বেপারী পাড়া, ছোটপুল, শান্তিবাগ, হালিশহর হাউজিং এষ্টেট, নয়াবাজার এলাকার নিচতলার অধিকাংশ বাড়িঘর দীর্ঘদিন খালী পড়ে আছে। ভাড়াটিয়ারা এসব এলাকা ছেড়েছে দীর্ঘমেয়াদী দুর্ভোগের কারনে। বাড়ি মালিকরা পড়েছে অর্থনৈতিক কষ্টে। বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়া কিংবা রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

এক্সেস রোড় ও পোর্ট কানেক্টিং রোড়ের নির্মান কাজ চলা অবস্থায় বিগত বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছিল এসব এলাকায়। ওই সময় ঘোর বর্ষার মধ্যে অনেক ব্যবসায়ী ও ভাড়াটিয়া এসব এলাকা ছেড়েছে। পুঁজি হারিয়ে পথে নেমেছেন অনেক ব্যবসায়ী। যারা এখনো টিকে আছে তারা প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন কখন শেষ হয় রাস্তার কাজ! অবস্থা দেখে মনে হয় আগামী বর্ষার আগে এই দুটি সড়কের কাজ শেষ হচ্ছে না। আবারও পানিতে ভাসতে হবে লক্ষাধিক মানুষকে। পর পর কয়েকদিন এক্সেস রোড় ও পোর্ট কানেক্টিং রোড় ঘুরে দেখা গেছে পুরো এলাকার রাস্তা যেন যুদ্ধবিদ্ধস্ত এক নগরীর অভিবাভকহীন জনপদ। এলাকাবাসী জানান,’ অত্যন্ত মন্থর গতীতে কাজ চলায় এখন আমরা দু:চিন্তায়। কবে এই কাজ শেষ হবে কেও বলতে পারছেন না।

রাস্তার নির্মান কাজ করার সুবাধে এক্সেস রোড় ও পোর্ট কানেক্টিং রোড়ে ইট, বালি ও কংক্রিটের ব্যবসা খুলে বসেছেন অনেকে। জি.ব্লকের ৫নং রোড়ের মুখে একজন ব্যবসায়ী আবাসিক এলাকায় প্রকাশ্যে চীনা পাথরের ব্যবসা চালাচ্ছেন। চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ সাইনবোর্ড লাগিয়ে পাথর বিক্রি, ভাঙ্গার কাজ করছেন রয়েল চক্ষু হাসপাতালের দেওয়াল ঘেষে। এক্সেস রোড়ে যে সব অংশে সামান্য কাজ হয়েছে সেখানে গড়ে উঠেছে বাস, ট্রাক, লরির অবৈধ ষ্ট্যান্ড। কোথাও ভ্যানগাড়িতে তরকারীর দোকান, বাস্তার পাশে বাজার। এক্সেস রোড় ও পোর্ট কানেক্টিং রোড়ের প্রশস্থতা গ্রাস করেছে এসব অবৈধ স্থাপনা। প্রভাবশালীরা গড়ে তুলেছে টেম্পু ষ্ট্যান্ড ও গ্যারেজ।

এক্সেস রোড় ও পোর্ট কানেক্টিং রোড়ে গাড়ীর গ্যারেজ, মেরামত ও রংয়ের কারখানা দীর্ঘদিন চলছে। পোর্ট কানেক্টিং রোড়ের নিমতলা থেকে অলংকার পর্যন্ত কাভার্টভ্যান, লরি, কনটেইনার এর জটলা যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ও দুর্ঘটনার সৃষ্টি করছে। এ দুটি রাস্তার উভয় পাশের এলাকার লোকজনের অভিযোগ, এমন ভাবে রাস্তা উঁচু করা হয়েছে আশপাশের বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে না। অপরদিকে নালার দুই পাশে যে দেওয়াল দেওয়া হয়েছে তার উপরের অংশে রাখা হয়েছে ছিদ্র। যা দিয়ে পাড়া মহল্লার ব্যবহারের পানি নালায় নামতে পারছে না। যে কারনে বর্ষায় নয় এই শীত মৌষুমেও পানিতে ডুবে আছে অনেক বাড়িঘর!

সরেজমিনে এক্সেস রোড় পরিদর্শন করে দেখা যায়, বর্ষায় বৃষ্টির পানি সরু নর্দমায় পানি সংকুলান হওয়ার নয়। জোয়ারের পানি ও বৃষ্টির পানি এবারের বর্ষায় বাসাবাড়িতে আরও বেশি ঢুকার সম্ভাবনা রয়েছে। রাস্তা উঁচু হলেও আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্টান নিচু হয়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আছেন আতঙ্কে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরা আশঙ্খা করছেন, রাস্তা উঁঁচু করার কোন সুফল পাবেন না এলাকাবাসী। কারন মহেষখালের মুখে স্যুইচগেইট না হওয়াতে আগ্রাবাদ ও হালিশহরবাসী এবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সম্মুখীন হতে পারেন। নদী থেকে জোয়ারের পানি শহরে ঢুকার পথ ঠেকাতে না পারলে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে জলমগ্ন হবে শহরের নির্মাঞ্চল।

এলাকাবাসী জানায়,’ আমরা এমন দুর্ভোগে আছি, বাড়িঘরে কোন অতিথি আসছেন না, বিয়ের উপযুক্ত মেয়ের সমন্ধ আসছে না। বাহিরের লোকজন আসলে নাক সিটকায়’। দুই লেইনের বিশাল সড়কের পানি প্রবাহের জন্য পুরনো নালাকে আরও সরু করা হয়েছে। যে কারনে এ নালা দিয়ে দ্রুত পানি প্রবাহ সম্ভব নয়। ধুলোবালিতে আচ্ছন্ন আগ্রাবাদ এক্সেস রোড় ও পোর্ট কানেক্টিং রোড়ের আশপাশের এলাকার বাড়িঘর। মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে পরিস্কার জামাকাপড় নিয়ে, ঘরে ঢুকছে ধুলোবালিতে পরিপুর্ন হয়ে। প্রতিটি মহল্লায় ময়লা -আবর্জনা ও পানি নিস্কাশন বন্ধ হয়ে দুর্গন্ধের বিস্তার ঘটাচ্ছে। নালা নর্দমার পুতিগন্ধময় ময়লা পানি ঢুকছে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্টানে। এসব ময়লা পানি ডিঙ্গিয়ে কোমলমতি শিশুরা যাচ্ছে স্কুলে। রোগ জীবানু ছড়াচ্ছে।

এক্সেস রোড়ে ব্যবসা করেন সন্দ্বীপ ফিজিও থেরাপী সেন্টারের ফিজিও বেলাল মোহাম্মদ। তিনি বলেন,’ এক্সেস রোড়ের আমার থেরাপী সেন্টারে রাস্তার কাজ শুরুর পর ৫০ ভাগ রোগী কমে গেছে। এখন ষ্টাফের বেতনও হয় না। তিনি জানান,’ অনেক ফার্নিসারের শো-রুম বন্ধ হয়ে গেছে। বড়পুল এলাকা এখন ধোলাই খাল হয়ে গেছে। লোহা লঙ্করের গ্যারেজ যত্রতত্র। এলাকাবাসী জানান, নরক যন্ত্রনার অবসান হবে কবে মানুষ তা বলতে পারছেন না। নিয়ম নীতি ও শৃঙ্খলার কোন বালাই নেই এই উন্নয়নযজ্ঞে। মানুষের ভোগান্তির দৃশ্য যেন কর্তৃপক্ষ দেখছেন না। দেখার কেউ নেই। ছোটপুল থেকে বড়পুল ও পুলিশ লাইনের পাশেই চলছে মাদক ব্যবসা। টোকাই, বখাটে ও মাস্তানরা চালাচ্ছে এসব ব্যবসা। সর্বোপরি রাস্তার বেহাল দশার সাথে পরিবেশের দুষন প্রত্যক্ষ করছে সাধারন মানুষ।

এ বিভাগের আরও খবর

Leave A Reply

Your email address will not be published.